Friday, December 23, 2011

তাঁর নামের সঙ্গে বিশেষণের দরকার নেই



তাঁর নামের সঙ্গে বিশেষণের দরকার নেই
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ॥ আবদুর রাজ্জাক চলে গেলেন (ইন্নালিলস্নাহি...রাজিউন)। লন্ডনের একটি নয় দুটি হাসপাতালে দীর্ঘ কয়েক মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। দীর্ঘকাল লিভারের জটিল অসুখে ভুগছিলেন। তাঁর দেহে নতুন লিভার সংযোজন জরুরী হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত একটি লিভারের ব্যবস্থা হলো। কিন্তু সেটি সুস্থ লিভার নয়। চিকিৎসায় অর্থাভাবও ছিল। সেই অর্থের সংস্থান হলো। কিন্তু নতুন লিভার সংস্থাপনের মতো শারীরিক অবস্থা তাঁর ছিল না। ডাক্তাররা তাঁর দেহে অস্ত্রোপচারের জন্য সময় নিচ্ছিলেন। তাঁর পর তো দেখা গেল, যার কাছ থেকে লিভার পাওয়া নিশ্চিত ছিল তিনি নিজেই অসুস্থ।
একটি লিভারের অভাবে আবদুর রাজ্জাককে বাঁচানো যাবে না, এটা তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসকরাও বলছিলেন, তাঁর শারীরিক অবস্থা অপারেশন সহ্য করার মতো সবল হয়ে ওঠেনি। তাঁকে শেষ পর্যনত্ম লাইফ সাপোর্ট মেশিনে রাখা হয়েছিল। যখন দেখা গেল তাঁর জীবন রৰার আর কোন উপায় নেই, তখন আজ (২৩ ডিসেম্বর শুক্রবার) তাঁর শরীর থেকে লাইফ সাপোর্ট মেশিন খুলে নেয়া হয়। দুপুরের পরই সারা লন্ডন শহরে খবর প্রচারিত হয় আব্দুর রাজ্জাক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
তাঁর মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে যখন তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম, তখনই দেখেছি রোগশয্যায় একটি কঙ্কাল পড়ে আছে। আমার দীর্ঘকালের চেনা আব্দুর রাজ্জাক আর নেই। আমাকে যখন চিনলেন, তখন তাঁর চোখে পানি। তাঁকে দেখাশোনা করছেন এমন এক যুবকের মুখে শুনলাম, রাজ্জাক আমলকী খেতে চান। তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করা হয়েছিল।
সত্তর বছর বয়সের মৃত্যুকে অকাল মৃত্যুই বলব। বাংলাদেশের রাজনীতির এই ঘনঘটার দিনে আবদুর রাজ্জাকের বড় প্রয়োজন ছিল। গণতান্ত্রিক শিবিরের আগামী দিনের আরও জটিল সংগ্রামে আবদুর রাজ্জাক থাকবেন না_ এটা ভাবতেও শঙ্কা হয়। স্বাধীনতার শত্রম্নপৰের শিবির তো শূন্য হচ্ছে না। শূন্য হচ্ছে স্বাধীনতার পক্ষের শিবির। এই শূন্যতা পূরণ করবে কারা? পূরণ হবে কিভাবে?
বঙ্গবন্ধুর দুই বিশ্বস্ত যুববাহুর মধ্যে একজন ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক এবং আরেকজন তোফায়েল আহমেদ। তাদের দু'জনের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে ছিল একই রাজনৈতিক লৰ্যের গভীর মৈত্রী দু'জনের মধ্যে। আবদুর রাজ্জাকের শরীরে লিভার সংস্থাপনের দিনৰণ যখন চিকিৎসকরা ঠিক করেছিলেন, তখন তোফায়েল দু'দুবার ঢাকা থেকে লন্ডনে ছুটে এসেছেন, আর রাজ্জাক ভাইয়ের জীবন- মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তাঁর পাশে থাকার জন্য। কিন্তু রাজ্জাকের শারীরিক অবস্থার জন্য ও লিভারের অভাবে অস্ত্রোপচার দুই দুইবার স্থগিত করতে হয়েছে।
গত পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবদুর রাজ্জাক একটি নাম, যে নামের কোন পরিচয়, কোন বিশেষণের দরকার নেই। আবদুর রাজ্জাক নিজেই বলতেন, 'আমি বঙ্গবন্ধুর একজন শিষ্য, এটাই আমার একমাত্র পরিচয়।' বঙ্গবন্ধু তাঁকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে, বাকশাল গঠনের পর সংগঠনের তিন সেক্রেটারির অন্যতম সেক্রেটারি তাঁকে করেছিলেন। আর দু'জন ছিলেন জিল্লুর রহমান (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) এবং শেখ ফজলুল হক মণি। বঙ্গবন্ধু তাঁকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগেরও প্রধানের পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর শাহাদের পর আওয়ামী লীগ সংগঠনের ভিত্তি ধ্বংস হতে না দেয়া, শেখ হাসিনাকে দলের নেতৃত্ব গ্রহণে টেনে আনা থেকে শুরু করে ঘাতক দালাল নিমর্ূল আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দান, সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহসী নেতৃত্ব গ্রহণ অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পৰের শিবিরে আবদুর রাজ্জাক ছিলেন একজন সর্বৰণিক সেনাপতি। প্রথম হাসিনা সরকারের পানি সম্পদমন্ত্রী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ ও গঙ্গার পানির হিস্যা লাভের চুক্তি সম্পাদনেও তাঁর ছিল সফল ভূমিকা।
আজ শুক্রবার তাঁর মৃতদেহ আমার বাসার অদূরে লন্ডনের এক হাসপাতালে যখন কফিনে তোলার জন্য প্রস্তুতি চলছে, তখন স্মৃতিচারণ করার মতো মনমানসিকতা কোনটাই আমার নেই। তিনি ছিলেন আমার ছোট ভাই এবং দীর্ঘকালের বন্ধু। লন্ডনে এলেই আমার সঙ্গে দেখা করতেন। ঢাকায় গেলেও আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে আসতেন। তাঁকে হারানোর বেদনা আত্মীয় বিয়োগব্যথার চাইতেও বেশি। মনমানসিকতা একটু স্বাভাবিক হলে তাঁর সম্পর্কে একটি দীর্ঘ স্মৃতিকথা লেখার ইচ্ছা রাখি। এই মুহূর্তে তাঁর শোকসনত্মপ্ত স্ত্রী ও পরিবার পরিজনকে আন্তরিক সমবেদনা জানাই এবং প্রার্থনা করি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আবদুর রাজ্জাক যেন মৃত্যুর পরেও অনন্ত শক্তি ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকেন।
[লন্ডন, ২৩ ডিসেম্বর, শুক্রবার, ২০১১

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুর রাজ্জাক আর নেই

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুর রাজ্জাক আর নেই।

দীর্ঘ রোগভোগের পর লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্যের। শুক্রবার লন্ডন সময় বেলা ৩টা ৫০ মিনিটে আব্দুর রাজ্জাকের লাইফ সাপোর্ট খুলে নিয়ে মৃত্যুর ঘোষণা দেন লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা, বাংলাদেশে সময় তখন রাত ৯টা ৫০ মিনিট। লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার রাশেদ চৌধুরী হাসপাতালে উপস্থিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিনিধি সৈয়দ নাহাস পাশাকে এ তথ্য জানিয়েছেন। যকৃৎ (লিভার), বৃক্ক (কিডনি) ও ফুসফুসে জটিলতা নিয়ে তিন মাসের বেশি সময় ধরে লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন রাজ্জাক। যকৃৎ প্রতিস্থাপনের জন্য লন্ডন গেলেও পরে অন্য দুটি অঙ্গেও সমস্যা দেখা দেয়। একাত্তরে মুজিব বাহিনীর অন্যতম পুরোধা এবং ’৯০ এর দশকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাািবতে সূচিত আন্দোলনের সংগঠক এবং গণআদালতের অন্যতম উদ্যোক্তা রাজ্জাকের বয়স হয়েছিলো ৬৯ বছর। তিনি স্ত্রী ফরিদা রাজ্জাক এবং দুই ছেলে রেখে গেছেন। রাজ্জাকের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার ডামুড্ডায়। ইমাম উদ্দিন ও আকফতুন নেছার সন্তান রাজ্জাক যতবার সেখান থেকে নির্বাচন করেছিলেন, ততবারই বিজয়ী হন। বর্তমান সংসদেও প্রতিনিধিত্ব করছিলেন রাজ্জাক, পাশাপাশি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তিনি। রাজ্জাক লাইফসাপোর্টে থাকলেও বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজ্জাকের মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করে এবং সেই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতার শোকবার্তার কথাও জানায়। তবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আওয়ামী লীগ কার্যালয় এবং বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে কেউ তখন পর্যন্ত এ বিষয়ে মুখ খুলছিলো না। রাজ্জাকের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী তোফায়েল আহমেদ সন্ধ্যা ৭টায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি এক ঘণ্টা আগেও যোগাযোগ করেছিলাম। তখন পর্যন্ত লাইফসাপোর্ট খোলা হয়নি।” রাজ্জাকের চিকিৎসার খোঁজ-খবর লন্ডন দূতাবাসের কর্মকর্তারা শুরুতে না নেওয়ায় তা নিয়ে সংসদে ক্ষোভও প্রকাশ করেছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও রাজ্জাকের দীর্ঘদিনের সহকর্মী তোফায়েল। রাজ্জাক ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে বাকশাল নামে আলাদা দল নিয়েই চলেন তিনি। ’৯০ এর দশকে বাকশাল আওয়ামী লীগে একীভূত হয়। আওয়ামী লীগে ফেরার পর সভাপতিমণ্ডলীতে স্থান পান রাজ্জাক। দীর্ঘদিন দলের নীতি-নির্ধারণী এই ফোরামে দীর্ঘদিন ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকারে পানিসম্পদমন্ত্রীও করা হয় তাকে। গঙ্গা পানিবন্টন চুক্তির জন্য স্মরণীয় তিনি। তবে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর আওয়ামী লীগের যে কজন নেতা সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পান, তার মধ্যে রাজ্জাকও ছিলেন। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলেও মন্ত্রিসভায় স্থান হয়নি রাজ্জাকের। এরপর ২০০৯ সালের দলের সম্মেলনে নীতি-নির্ধারণী ফোরামের সদস্যপদও হারান তিনি। তাকে করা হয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে রাজ্জাকের স্মৃতিচারণ

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে রাজ্জাকের স্মৃতিচারণ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার নানা ষড়যন্ত্র চলছিল। শোনা যাচ্ছিল-এমনকি হতে পারে কমান্ডো হামলা। এমন পরিস্থিতিতে রেসকোর্সে ভাষণের আগে-পরে বঙ্গবন্ধুকে আনা নেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হিসেবে সেই দায়িত্ব ছিল আমার। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাসা থেকে সমাবেশস্থলে আনা নেওয়ায় বিশেষ কৌশল নিতে হয়েছিল। পূর্ব পরিকল্পিত যাত্রাপথ পাল্টে বঙ্গবন্ধুকে আনা হয় রেসকোর্সে। ভাষণের পরেও বদলাতে হয়েছিল পথ। ধানমণ্ডি থেকে রেসকোর্স হয়ে ফের বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পরই স্বস্তিবোধ করছিলাম। ১৯৭১ সালে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ১ মার্চেই বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত দেন ৭ মার্চে ভাষণ দেবেন তিনি। এসময় দলমত নির্বিশেষে ছাত্র-যুবা, আওয়ামী লীগসহ শীর্ষনেতারা গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তাদের মতামত দিতেন। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত সমাবেশে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে ভাষণ দেবেন। ওই দিন কী ঘোষণা দেবেন বঙ্গবন্ধু? এ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। আগেরদিন (৬ মার্চ) ইকবাল হল থেকে সব ছাত্র আমার কাছে এসে দাবি করলো, কাল (৭ মার্চ) যেনো স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। রাতে ৩২ নম্বরে গেলাম। বঙ্গবন্ধু বাসার উপরতলায় ছিলেন। অনেকের মাঝে স্বাধীনতার ডাক দেওয়া নিয়ে দ্বিমতও রয়েছে। তাদের মত, স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই তো দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে না। বঙ্গবন্ধু বলেন-‘চুপ থাক’। টিপিক্যাল ওয়েতে বঙ্গবন্ধু আমাকে চোখ টিপ দিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, “যথাসময়ে সঠিক কথাটাই বলব আমি।” এদিকে বঙ্গবন্ধুকে ৭ মার্চ রেসকোর্সে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করি। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হিসেবে আমার উপর দায়িত্ব ছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়া ও আনার। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকার। ৭ মার্চ। আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ৭ মার্চের সকাল থেকেই আমি ছিলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে। ঠিক হলো তিনটি গাড়ি আমাদের সঙ্গে রেসকোর্সে যাবে। দুইটি গাড়িতে থাকবে যাদের গোঁফ আছে এবং তাদের পরণে থাকবে পাঞ্জাবি। চুল থাকবে ব্যাক ব্রাশ করা। সামনের গাড়িতে আমরা। ঠিক দুইটার সময় ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বের হন বঙ্গবন্ধু। আমি অত্যন্ত চিন্তিত ছিলাম। কোনো অঘটন ঘটে কিনা! তখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র চারদিকে। বলা হয়েছিল-কমান্ডো অ্যাটাক করে হত্যা করা হবে। আকাশে হেলিকপ্টারও ঘুরছে। অ্যাটাক হলে বাঁচানো যাবে না। ৩২ নম্বর থেকে এলিফ্যান্ট রোড, তৎকালীন পিজি হাসপাতালের পাশ দিয়ে রেসকোর্সে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যাওয়ার কথা। যাত্রার শুরুতেই তাৎক্ষণিকভাবে আগের সব পরিকল্পনা বদলে ফেলি। আমি কৌশলটা নিলাম-যেভাবে যাওয়ার কথা ওভাবে যাবো না। বঙ্গবন্ধুকে আমাদের গাড়িতে তুললাম। গাড়ির ভেতরে বঙ্গবন্ধুকে রেখে আমরা এমনভাবে দাঁড়ালাম যাতে তাকে দেখা না যায়। এবার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রওনা দিলাম নিউমার্কেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে হাইকোর্টের পাশ দিয়ে রেসকোর্সের পথে। বিশাল জনতার ঢেউয়ের মধ্যে সোজা মঞ্চে উঠলেন তিনি। পিছনে দাঁড়িয়ে মহিউদ্দিন, আমি আর গাজীউল হক। সমাবেশে কোনো সভাপতি ছিল না। গিয়েই বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেন, “মাইকটা দে।” জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু-স্লোগান দুটি দিতে দিতেই বঙ্গবন্ধুকে মাইক দিই। এর পরের ঘটনাতো ইতিহাস। ১৭ মিনিটে ঐতিহাসিক ভাষণটি শেষ করেন তিনি। লাখ-লাখ মানুষ দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন প্রতিটি কথা। আর আমার প্রতিটি মুহুর্ত ছিল আশঙ্কার। কারণ, মাথার উপরে তখনো হেলিকপ্টার ঘুরছে। ওই ভাষণেই সব নির্দেশনা পেয়ে গেলাম আমরা। জাতির জনক ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, ডাক দেন স্বাধীনতা সংগ্রামের। মনে হল, আজকে থেকেই আমরা লডাই শুরু করে দিলাম। দেশ স্বাধীন হবেই। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ২৫ মার্চ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ভাষণ দিয়ে নেমেই বঙ্গবন্ধু সোজা উঠেন গাড়িতে। কেউ জানে না আমরা কোন দিকে কোথায় যাচ্ছি। সেই একই কায়দায় (আগের পরিকল্পনা পাল্টে)। সমাবেশস্থল থেকে শাজাহানপুর, মতিঝিল কলোনির পাশ দিয়ে (আজকের) শেরে বাংলানগর হয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। স্বস্তি পেয়েছি, বঙ্গবন্ধুকে একেবারে, সঠিকভাবে বাড়িতে পৌঁছে দিতে পেরে। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু রাজাকারমুক্ত হয়নি। এটাই দুঃখজনক। আজ পর্যন্ত দেশের মানুষ মুক্তির স্বাদ পায়নি। অর্থনৈতিক, সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়তে পারলেই বঙ্গবন্ধুর আত্মা শান্তি পাবে। এখন বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমার তিনটি চাওয়া। দেশকে রাজাকারমুক্ত করতে হবে, সুখী সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর সোনার বাংলা গড়তে হবে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে। এই তিনটি কাজই এগিয়ে নিয়ে যাক নতুন প্রজন্ম। পরিচয়: ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে øাতকোত্তর ডিগ্রি নেন আব্দুর রাজ্জাক। ১৯৬৫ থেকে ৬৭ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্য বর্তমান সংসদেও প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, পাশাপাশি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তিনি।

Thursday, December 15, 2011

বাঙালির বিজয়ের ৪০ বছর পূর্ণ হলো : আজ উৎসব, আজ আনন্দ



বাঙালির বিজয়ের ৪০ বছর পূর্ণ হলো : আজ উৎসব, আজ আনন্দ






মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের ৪০ বছর পূর্ণ হলো আজ ১৬ ডিসেম্বর,



শুক্রবার। আজ মহান বিজয় দিবস। আজকের প্রভাতে পূর্ব দিগনেৱ যে নতুন সূর্যের উদয় হলো তার রঙ এতো লাল কেন? সেকি ‘হরিদাসী’র সিঁথির সিঁদুর মেখে, নাকি বীর মুক্তিসেনার রক্তের সাগরে স্নাত হয়ে এসেছে বলে? বিজয় আনন্দের, বিজয় গৌরবের, বিজয় মাথা তুলে দাঁড়াবার। কিন্তু বাঙালির বিজয় একাধারে বেদনারও। ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান আর কয়েক লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত যে বিজয়- সে তো বেদনার অশ্রম্নতে সিক্ত হবেই। তবু শত বেদনার মধ্যেও, বিজয় মানেই যে উৎসব! আজ তাই বাঙালির বিজয় উৎসব। ঘরে ঘরে আজ উড়ছে বিজয় কেতন। হৃদয়ে হৃদয়ে স্ফুরিত আনন্দ প্রভা। এই বাংলাদেশ আমাদের, এই স্বাধীনতা আমাদের। এই বিজয় আমাদের।মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির গৌরবময় বিজয়ের ৪০তম বার্ষিকী আজ। এ জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে গৌরবের মহিমায় সমুন্নত অনন্য এই দিনটি। এমন একটি দিনের প্রতীক্ষায় এ দেশের মানুষ প্রহরের পর প্রহর গুনেছে, লড়াই করেছে জীবন বাজি রেখে, ঝরিয়েছে বুকের তাজা রক্ত। অবশেষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাসের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে অর্জন করে চূড়ানৱ বিজয়। পূর্ণ হয় মুক্তিপাগল বাঙালির স্বপ্নসাধ। প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। দেশের সর্বত্র আজ আনন্দ-উৎসব, শোক ও শ্রদ্ধার এক অপূর্ব সম্মিলনে পালিত হবে জাতীয় জীবনের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এই দিন- বিজয়ের ৪০তম বার্ষিকী।বাঙালির জাতীয় জীবনে এবারের বিজয় দিবস এসেছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন মাত্রায়। এবার যখন আমরা বিজয় উৎসব উদযাপন করতে যাচ্ছি তখন দেশ চালাচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধেরই চেতনায় ঋদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তিন বছর বয়সী এ সরকার এরই মধ্যে শুরম্ন করেছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের আনুষ্ঠানিক বিচার। চিহ্নিত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার দাবিতে গোটা জাতি আজ একাট্টা। এবারের বিজয় দিবসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করবে জাতি। শপথ নেবে একাত্তরের পরাজিত শত্রম্নদের নির্মূল করার।এদিকে, উচ্চ আদালতের রায়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৭২-এর সংবিধান। ফিরে এসেছে সংবিধানের চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র,বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বাংলাদেশ আবার ফিরে এসেছে সাংবিধানিকভাবে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ধারায়। রম্নদ্ধ হয়েছে ধর্মের জিগির তুলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পথ। এই অর্জন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে নিঃসন্দেহে এক ধাপ অগ্রগতি।বাঙালি বরাবরই স্বাধীনচেতা জাতি। বীরত্বপূর্ণ লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস এ জাতির গৌরবময় ঐতিহ্যেরই অংশ। তবুও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালির জন্মভূমি হয়েছে বহিরাগত শাসক-শোষকদের করতলগত। হানাদার বিদেশী শাসকরা বারবার আক্রমণ ও দখল করেছে এ দেশের শাসনদ-, লুণ্ঠন করেছে সম্পদ, শোষণ-নিষ্পেষণে করেছে জর্জরিত। কিন্তু কোনোভাবেই পারেনি বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে কেড়ে নিতে। তাই সুযোগ পেলেই এ দেশের মানুষ করেছে বিদ্রোহ। শত্রম্নর বিশাল শক্তিমত্তা জেনেও অসীম সাহসে নেমেছে অসম লড়াইয়ে। বাঙালির এই লড়াই-সংগ্রামেরই চূড়ানৱ বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালে।১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলা পাকিসৱান রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়। কিন্তু পাকিসৱানের জন্মলগ্নেই শাসকগোষ্ঠী বাঙালির অসিৱত্বের ওপর আঘাত হানে। ১৯৪৮ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জনসভা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিসৱানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিসৱানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ছাত্ররা উভয় স্থানেই তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘোষণার প্রতিবাদ জানায়। ছাত্র সমাজের এ প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় আমাদের মাতৃভাষা ‘বাংলা’র মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা দিবস উপলক্ষে আহূত ধর্মঘটে পিকেটিং করার সময় পূর্ব বাংলার সচিবালয় ইডেন বিল্ডিংয়ের গেইট থেকে পুলিশ শেখ মুজিবসহ নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে নিক্ষেপ করে। দিনে দিনে ছাত্র সমাজের ভাষার অধিকারের এ আন্দোলন ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রম্নয়ারি আন্দোলনের এক পর্যায়ে কারাগারে আটক শেখ মুজিবুর রহমানের পরামর্শ অনুযায়ী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল বের হলে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকেই হতাহত হন। ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের’ অনমনীয় এ আন্দোলনের ফলে পাকিসৱানের অবাঙালি শাসকগোষ্ঠী বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন নিছক একটি ভাষা আন্দোলনই ছিল না। এ আন্দোলন ছিল বাঙালির ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি তথা জাতীয় অসিৱত্ব রক্ষার একটি সংগ্রামের সূচনা। এ ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই আসে ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২-এর শিক্ষা সংকোচন নীতি ও আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ’৬৬ সালের বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ও ছাত্রদের ১১ দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন এবং চূড়ানৱ পর্যায়ে ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম।পাকিসৱানের রাষ্ট্র কাঠামোয় বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ সম্ভব নয় বিবেচনা করে মূলত ১৯৬২ সালেই তৎকালীন ছাত্রনেতাদের মধ্যে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার চিনৱার উন্মেষ ঘটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ এ ছাত্রনেতারা গোপনে ছাত্রদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতির লক্ষ্যে সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ ‘স্বাধীন বাংলা বিপস্নবী পরিষদ’ গঠন করেন সংক্ষেপে যাকে ‘নিউক্লিয়াস’ বলা হতো। ’৬৬ সালের ৫ ফেব্রম্নয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় জাতীয় সংহতি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি সংবলিত ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই ৬ দফাই ছিল মূলত বাঙালির মুক্তি সনদ। পরবর্তী সময়ে ৬ দফাকে ধারণ করে ছাত্ররা ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে। ৬ দফা ও ১১ দফা বাঙালির প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। এ সময় পাকিসৱান সরকার মিথ্যা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’য় বঙ্গবন্ধুকে অভিযুক্ত ও বন্দী করে। এতে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। এক পর্যায়ে এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ’৬৯-এর ২৫ মার্চ আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে সেনাবাহিনী প্রধান ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হসৱানৱর করেন। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার গণদাবিকে উপেক্ষা করতে পারেনি- সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ’৭০-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সাংবিধানিক প্রথা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হসৱানৱরের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও পাকিসৱানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হসৱানৱরে টালবাহানা শুরম্ন করে। শুরম্ন হয় ষড়যন্ত্র। ’৭১ সালের ১ মার্চ এক বেতার ঘোষণায় ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ আহূত পার্লামেন্ট অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায়। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অগ্নিগর্ভ ভাষণ, তার বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- জাতির চূড়ানৱ লড়াই-সংগ্রামের পথ দেখায়। শুরম্ন হয় অসহযোগ আন্দোলন। শুরম্ন হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিও।এদিকে সংকট নিরসনে আলোচনার নামে কালক্ষেপণ শুরম্ন করে পাকিসৱানি সামরিক জানৱা। এই কালক্ষেপণের সুযোগে পাকিসৱানি শাসকগোষ্ঠী এ দেশে নিয়ে আসে বিপুল সংখ্যক সৈন্য ও অস্ত্র। তারপর ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিসৱানি বাহিনী ঘুমনৱ বাঙালির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের ধারণা ছিল অতর্কিত আক্রমণে বাঙালি হতচকিত হয়ে পড়বে, হত্যা নির্যাতনের ভয়ে স্বাধীনতার দাবি পরিত্যাগ করবে। কিন্তু তারা জানতো না বাঙালির আপোসহীন বীরত্বের ইতিহাস। তারা অনুভব করতে পারেনি বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহা কতোটা তীব্র, অদম্য। পাকিসৱানি শাসকগোষ্ঠীকে হতবাক করে দিয়ে সেই কালরাতেই রম্নখে দাঁড়ায় স্বাধীনতাকামী বাঙালি। শুরম্ন হয় প্রতিরোধ সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ।একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর, ৯ মাস পাকিসৱানি হানাদার বাহিনী এ দেশে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তার কোনো পরিমাপ হয় না। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে মাটি। সম্ভ্রম হারিয়েছেন, চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২ লাখ মা-বোন। জাতি এ যুদ্ধে হারিয়েছে তার শ্রেষ্ঠ সনৱান বুদ্ধিজীবীদের। পাকিসৱানি বাহিনীর গণহত্যার প্রত্যুত্তরে একাত্তরের ২৬ মার্চ থেকে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে বিজয় অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে অকুতোভয় বাঙালি জাতি যে যুদ্ধ শুরম্ন করেছিল তার সমাপ্তি হয় আনন্দ-বেদনার সম্মিলনে ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর।২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিসৱানি সেনাবাহিনী অতর্কিত আক্রমণ চালায় ঢাকাসহ দেশের সবগুলো বড় শহর ও সেনানিবাসে বাঙালি রেজিমেন্টগুলোর ওপর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রাত ১২টার পর তার ধানম-ির বাসভবনে পাকিসৱানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হন। বন্দী হওয়ার পূর্বে তিনি দলীয় নেতৃবৃন্দকে করণীয় বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনা দিয়ে অবস্থান পরিবর্তনের কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা অয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে সারা দেশে পৌঁছে যায়। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন। তাছাড়া, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা লিফলেট আকারে বিলিও করা হয়। পরে ২৭ মার্চ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তার এ ঘোষণা বেতার কেন্দ্র থেকে একাধিকবার প্রচার করা হয়।ইতোমধ্যে শুরম্ন হয়ে যায় প্রতিরোধ সংগ্রাম। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনতার সহযোগিতায় মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত হন। কিন্তু শক্তিশালী হানাদার পাকিসৱানি সৈন্যদের বিরম্নদ্ধে বেশিদিন টিকতে না পেরে প্রতিরোধ যোদ্ধারা সীমানৱ অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও ভারতে গিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। বঙ্গবন্ধুর পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী ১৯৭১’র ১০ এপ্রিল নির্বাচিত সাংসদরা ভারতের আগরতলায় একত্রিত হয়ে এক সর্বসম্মত সিদ্ধানেৱ সরকার গঠন করেন। এ সরকার স্বাধীন সার্বভৌম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’। স্বাধীনতার সনদ বলে এ সরকারের কার্যকারিতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়। ১৭ এপ্রিল এই প্রবাসী সরকার মেহেরপুরের ভবেরপাড়ায় (বৈদ্যনাথতলা) আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করে। বাঙালির প্রাণপুরম্নষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে শপথ গ্রহণের এ স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। মুজিবনগরে শপথ নেয় বলে এ সরকার মুজিব নগর সরকার নামেও আখ্যায়িত হয়ে থাকে। এ সরকারের রাষ্ট্রপতি পদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়। এ সরকারের নেতৃত্বে এবং বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সহযোগিতায় পরিচালিত হয় দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। অবশেষে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত বিজয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে অবনত মসৱকে দাঁড়িয়েছিল হানাদার পাকিসৱানি বাহিনী। পাকিসৱানি জেনারেল নিয়াজী তার ৯৩ হাজার সৈন্য এবং বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এই দিনে। আর সেই থেকে এই দিনটি হয়ে ওঠে আমাদের বিজয়ের স্মারক- ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস।

বিজয়ের ৪০ বছর


বিজয়ের ৪০ বছর" বিজয়ের ৪০ বছর
ঢাকা, ডিসেম্বর ১৬ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের এই দিনে দুই যুগের পাকিস্তানী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশ। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের এ দিনটি উদযাপনে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। সকালে শেরে বাংলা নগরে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে (পুরনো বিমানবন্দর) ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্যদিয়ে মহান বিজয় দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সূর্যোদয়ের সঙ্গেসঙ্গে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হবে। রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপগুলো জাতীয় পতাকা ও রং-বেরংয়ের বিভিন্ন পতাকায় সজ্জিত করা হবে। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপসানালয়ে মোনাজাত ও প্রার্থনা করা হবে। হাসপাতাল, জেলখানা, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা, শিশুপরিবার ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানগুলোয় উন্নতমানের খাবার সরবরাহ করা হবে। রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এদিন বিকেলে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সংবর্ধনা দেবেন। বাণী রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, “এ বছর বিজয়ের চল্লিশ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই এবারের বিজয় দিবস উদ্যাপন তাৎপর্যপূর্ণ। ভৌগোলিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য।” প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, “আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। জাতির পিতার অবিসংবাদিত নেতৃত্বে বাঙালি জাতির দীর্ঘ তেইশ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত ফসল ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।” “বর্তমান সরকার সংবিধানে পনেরতম সংশোধনীর মাধ্যমে জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকে প্রতিহত করতে এ উদ্যোগ এক মাইলফলক।” সেই দিন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স (পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও যুদ্ধে সক্রিয় সহায়তাকারী ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের যৌথ নেতৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করেন যুদ্ধে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দেওয়া লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আব্দুলাহ খান নিয়াজী। এর মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় পেয়ে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। ’৭১ এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর আগেই ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষণে ‘যার যা কিছু আছে, তা নিয়েই স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত’ থাকার আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ মার্চ তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। নানা কর্মসূচি সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রধানমন্ত্রীর পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে উপস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পুষ্পস্তবক দেবেন বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকরাও। এছাড়া সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবে। দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিএনসিসি, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ও ভিডিপি, কোস্টগার্ড এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করবে। প্রধানমন্ত্রী কুচকাওয়াজে সালাম গ্রহণ ও কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন। রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সালাম গ্রহণ করে থাকেন। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি এবার কুচকাওয়াজে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। কুচকাওয়াজে থাকবে বিমান বাহিনীর ফ্লাইপাস্ট, উড়ন্ত হেলিকপ্টার থেকে রজ্জু বেয়ে অবতরণ, প্যারাস্যুট জাম্প ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে যান্ত্রিক বহর প্রদর্শনী। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা, পোস্টার প্রদর্শনী ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দিবসটি উপলক্ষে পৃথক কর্মসূচি দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়েছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত : সবার কণ্ঠেই আওয়াজ ছিল দ্রম্নত হোক যুদ্ধাপরাধ বিচার



শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত : সবার কণ্ঠেই আওয়াজ ছিল দ্রম্নত হোক যুদ্ধাপরাধ বিচার








ফুলেল শ্রদ্ধা আর বিনম্র ভালোবাসায় দেশের শ্রেষ্ঠ সনৱান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করলো জাতি। শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাবনতচিত্তে দাঁড়িয়ে সবার অঙ্গীকার ছিল রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়বো। সবার কণ্ঠেই ছিল এক আওয়াজ, দ্রম্নত হোক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের দ্রম্নত বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানান তারা।যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবির মধ্য দিয়ে গতকাল বুধবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হয়েছে। কাকডাকা ভোরে জনতার ঢল নামে মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ আর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আসেন এবং ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সাংসদ এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা উপসি'ত ছিলেন। শ্রদ্ধা জানানোর পর প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার কাছে বিভিন্ন অনুযোগ জানান। প্রধানমন্ত্রী তাদের সেগুলো পূরণের আশ্বাস দেন।মুক্তিযোদ্ধাদের একজন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রম্নত শেষ করার দাবি জানালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষও তা-ই চায়।প্রধানমন্ত্রীর পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই প্রশাসক, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। সকাল ৭টার পর স্মৃতিসৌধ সর্বসৱরের মানুষের জন্য খুলে দেয়া হয়। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে স্মৃতিসৌধের বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। এ সময় দলটির মহাসচিব রম্নহুল আমিন হাওলাদার তার সঙ্গে ছিলেন।সকাল পৌনে ৮টার দিকে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আসেন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া। দলের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীকে সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেত্রী শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পসৱবক অর্পণ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরম্নল ইসলামসহ সিনিয়র নেতারা।তারপর একে একে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শুরম্ন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। শহীদ পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধা জানান হারানো স্বজনদের প্রতি। এছাড়াও দিনভর বিভিন্ন সংগঠন এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ স্মৃতিসৌধসহ বুদ্ধিজীবীনিধনযজ্ঞস'ল রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের ঢল নামে। এ সময় ফুলেল শ্রদ্ধায় রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধ ভরে ওঠে। আর এখানে আসা মুক্তিযোদ্ধারা নতুন করে দেশ গড়ার শপথ নিলেন। তাদের মনে ৪০ বছর ধরে যে ক্ষত জমেছে তাকে মুছে ফেলতে সরকারকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রম্নত বাসৱবায়ন করার আহ্বান জানান তারা। নানা সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে- এ কথা উলেস্নখ করে বধ্যভূমিতে আসা সাধারণ মানুষ এর সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন।৭১-এর এইদিনে দেশকে মেধাশূন্য করতে রাজাকার, আল-বদর বাহিনীরা বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে এখানেই হত্যা করেছিল। স্বাধীনতার পর দীর্ঘসময় পেরিয়ে গেলেও এখনো এসব হত্যার বিচার হয়নি। দেশের মানুষের জোরালো দাবি সত্ত্বেও কেন তা বাসৱবায়িত হয়নি সাধারণ মানুষের মনে এ প্রশ্নই তাড়া করছে।বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ : সকাল সাড়ে ৭টায় দলের কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারা দেশে সংগঠনের কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। সকাল সাড়ে ৬টায় মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং সকাল সাড়ে ৭টায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। সকাল ৯টায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন দলীয় নেতাকর্মীরা। বিকাল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আনৱর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্ব আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।জাতীয় পার্টি : জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে সকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পসৱবক অর্পণ করেন। এ সময় এইচ এম এরশাদ বলেন, আমরা চাই বিচার হোক। কিন' বিচারের কার্যক্রম খুব ঢিমেতালে চলছে।বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি : জাতির শ্রেষ্ঠ সনৱান বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সকালে পার্টির সভাপতি মনজুরম্নল আহসান খান এবং সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়।মইনুদ্দীন খান বাদলের নেতৃত্বে স্মৃতিসৌধে ফুল দেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) নেতাকর্মীরা। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাংসদ রাশেদ খান মেনন দলের পক্ষে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। জাসদের নেতা আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে বেদিতে ফুল দেন একদল নেতাকর্মী। সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের পক্ষে ফুল দিতে আসেন মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক হারম্নন হাবিব ও সুব্রত ঘোষ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : নানা কর্মসূচির মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উদযাপন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল সকাল সাড়ে ৭টায় সকল হল, উপাচার্য ভবন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে কালো পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমবেত হওয়া, সকাল ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন কবরস'ান, জগন্নাথ হল স্মৃতিসৌধ ও বিশ্বদ্যিালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলের স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ।বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের মানববন্ধন : গতকাল সকালে রাজধানীর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের মানববন্ধনে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তাদের হত্যাকা-ে সহযোগী রাজাকার, আলবদর বাহিনীর দৃষ্টানৱমূলক শাসিৱর দাবি জানানো হয়। মানববন্ধনে উপসি'ত ছিলেন স'ানীয় সরকার, পলস্নী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট তারানা হালিম, যুগ্ম-সম্পাদক অরম্নণ সরকার রানা, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানুসহ জোটের নেতারা।শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সিপিবি, নজরম্নল ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমী, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, মনন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগার, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন, শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবী সংগঠন, শহীদ পরিবারের সদস্যসহ সর্বসৱরের মানুষ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান। দিনের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে ছিল আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্মৃতিচারণ, চিত্রপ্রদর্শনী। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার, বিটিভি, জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও এফএম রেডিও বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এদিকে দিবসটি পালন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী, সরকারের সংশিস্নষ্ট মন্ত্রীবর্গ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সংগঠন-প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বাণী প্রদান করেছেন। রেডিও-টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচারিত হ"েছ। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।

Tuesday, August 16, 2011

সেরনিয়াবাতের বাসায় গুলিবিদ্ধ : সেই রাতের কথা মনে হলে আঁতকে ওঠেন ডা. জিল্লুর



সেরনিয়াবাতের বাসায় গুলিবিদ্ধ : সেই রাতের কথা মনে হলে আঁতকে ওঠেন ডা. জিল্লুর








ঘাতকের বুলেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েও বেঁচে থাকা ডা. খ ম জিল্লুুর রহমান এখনো রাতে আঁতকে ওঠেন। ১৫ আগস্টের সেই বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বারবার প্রিয় নেতার কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই রাতের ভয়াল ও লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ঘাতকরা এতোই পাষাণ যে তারা বঙ্গবন্ধুর ছোট শিশু সন্তান শেখ রাসেল ও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর শিশুপুত্র সুকান্ত বাবুকেও ওরা বাঁচিয়ে রাখেনি। নির্মমভাবে তাদেরকে হত্যা করেছে। ডা. জিল্লুুর বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার ৪০ বছর পর হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করেছেন দেখতে পেয়ে আমার কাছে ভালো লেগেছে।



যে বঙ্গবন্ধু না হলে দেশ স্বাধীন হতো না, আমরা বাংলাদেশ পেতাম না। সেই স্বাধীনতার স্থপতির খুনিদের বিচারে এতো বিলম্ব হওয়াটা জাতির জন্য বড় বেদনাদায়ক। গত ১৪ আগস্ট পবিত্র মাহে রমজানের তারাবির নামাজ আদায়ের পর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মর্মস্পর্শী ১৫ আগস্টের সেই ভয়াল রাতের বর্ণনা করেন তিনি। তিনি বলেন, তৎকালীন মন্ত্রী কামরুজ্জামান বরিশাল এলে ক্রিডেন্স ব্যান্ড তাকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা প্রদান করে। মন্ত্রী কামরুজ্জামান ক্রিডেন্স ব্যান্ডের গানে মুগ্ধ হয়ে ব্যান্ড দলকে ঢাকায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান এবং শিল্পীদের বেতারে গান গাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন। মন্ত্রীর আশ্বাসে ক্রিডেন্স ব্যান্ড দলের ১০ সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি মন্ত্রী আঃ রব সেরনিয়াবাতের বাসায় ওঠেন।



ওই দলের নেতৃত্ব দেন বরিশাল অপসোনিনের বর্তমান ম্যানেজিং ডিরেক্টর আঃ রউফ খান নান্টু। তার নেতৃত্বে ওই প্রতিনিধিদল ১৪ আগস্ট বিকালে আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় মিলাদে অংশগ্রহণ করেন। ডা. জিল্লুর বঙ্গবন্ধুর হাতে মিলাদের তবারক তুলে দেন। জিল্লুুর বলেন, রাতে মন্ত্রী কামরুজ্জামানের বাসায় একটি শিশুর জন্মদিনে আমরা ব্যান্ড দল অংশগ্রহণ করি। আমাদের ব্যান্ড দলের গানে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই পুরস্কৃত করেন। আমরা ক্রিডেন্স ব্যান্ড দল সেখান থেকে চলে এসে আঃ রব সেরনিয়াবাতের বাসার নিচতলার ফ্লোরে ঘুমানোর আয়োজন করি। ১৫ আগস্ট ভোররাতে হঠাৎ গুলির শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। কিছুক্ষণ পরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। তিনি সবাইকে ভেতরের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চুপচাপ থাকবে বলে চলে গেলেন দোতালায়। আমিসহ সবাই ভয়ে কাতর হয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাইরে সেনা সদস্যরা অস্ত্র হাতে বাড়ি ঘিরে রেখেছে। অল্প সময় পরই যে রুমে আমরা প্রথম শুয়েছিলাম সৈনিকরা সেই রুমের কাঁচের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ফাঁকা গুলি ছোড়ে।



সৈনিকরা অনেকে উর্দুতে গালাগাল করে আমাদের রুমের দরজা খুলতে নির্দেশ দেয়। কিছু সময় পরে আমি দরজা খুলে দিলে একজন সৈনিক ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন আমাদের সঙ্গে থাকা সৈয়দ গোলাম মাহমুদ ওই সৈনিকের পা জড়িয়ে ধরে বলেন, স্যার আমরা এই বাসার কেউ নই, আমরা এখানে গান গাইতে এসেছি। তখন ওই সৈনিক আমাদের সবাইকে ‘ফরোয়ার্ড’ বলে সামনের দিকে নিয়ে যায়। এ সময় দেখতে পাই দোতালা থেকে আঃ রব সেরনিয়াবাত ও তার পরিবার বর্গকে সৈনিকরা নিচে নিয়ে আসছে। ওই সময় আঃ রব সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবিকে একজন মেজরের সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখেছি। বেবিকে বলতে শুনেছি আপনারা কারা? কেন আপনারা এ বাসায় এসেছেন ? আপনারা জানেন এ বাসা বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতির বাসা। সৈনিকরা সবাইকে নিচতলায় ড্রইং রুমে নিয়ে আসে। ড্রইং রুমে আমরা ক্রিডেন্স ব্যান্ড দলের ৮-১০ জনসহ মোট ৩০-৩২ জন অবস্থানকালীন দেখতে পাই বাইরে প্রচ- গুলি হচ্ছে। এ সময় একজন সৈনিক ড্রইং রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ব্রাশ ফায়ার করছেন। একে একে অনেককেই লুটিয়ে পড়তে দেখে আমি বাঁচার জন্য প্রাণপণে আল্লাহকে ডাকতে থাকি। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার শরীরের নিচের অংশে অনেকগুলো গুলি লাগে (পরে জানতে পারি ১৩টি)। আমি নিচে লুটিয়ে পড়ি। তখনো আমার হুশ ছিল। সবকিছু দেখতে পাচ্ছি। ওই সৈনিক একাই পরপর ৩টি অস্ত্র দিয়ে রুমের মধ্যে ব্রাশ ফায়ার করলো। সবাই লুটিয়ে পড়ার পর অন্য একজন সৈনিক ১টি রিভলবার নিয়ে রুমের মধ্যে প্রবেশ করে অনেকের মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে। আমার ডান হাতে ২টি ও বাম হাতে ২টি গুলি করে। আজ আমি ১৭টি গুলির ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বেঁচে আছি। ওই সৈনিক রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর কে যেন আমাকে টেনে হিঁচড়ে ড্রইং রুমের সোফার নিচে ঢুকিয়ে দেয়। যাদের গায়ে গুলি লাগেনি তারা সৈনিকরা চলে যাওয়ার পর পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ আমাদের রুমে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার স্ত্রীর গায়েও গুলি লাগে। এ সময় হাসানাত ভাইকে চলে যেতে অনুরোধ করি। তখন তিনি ওই বাড়ি থেকে চলে যান। সকাল হলে রমনা থানার ওসি এসে সবাইকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। ওই মর্মস্পর্শী হত্যাকা-ে আমার সঙ্গে থাকা আবু নঈম খান রিন্টু গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। ক্রিডেন্স ব্যান্ড গ্রুপের সৈয়দ গোলাম মাহমুদ, বাবু ললিত কুমার দাস, রফিকুল ইসলাম পিন্টু, দিলীপ দাও গুলিবিদ্ধ হন। আমাদের সঙ্গে থাকা লে. কর্নেল (অব.) কায়জার, জন মাইকেল চৌধুরী ও মুকুল দাসের গায়ে গুলি লাগেনি। ওই ভয়াল রাতের দৃশ্য আজো মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। রাতে মাঝে মধ্যে এখনো আঁতকে উঠি।

Sunday, August 14, 2011

আজ বাঙালির শোকের দিন



আজ বাঙালির শোকের দিন




বাঙালির শোকের দিন ১৫ আগস্ট আজ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩৬তম শাহাদাতবার্ষিকী, জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির জাতীয় জীবনে শোকাচ্ছন্ন রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত এক কালো দিন আজ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরে একদল রক্তলোলুপ ষড়যন্ত্রকারীর নীলনকশা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর আদর্শচ্যুত কয়েকজন হিংস্র লোভী ঘাতক ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটিতে সপরিবারে হত্যা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। বিগত ৩৬টি বছর ধরে সেই ঐতিহাসিক বাড়িটির দেয়ালে দেয়ালে, সিঁড়িতে, সারাবাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে আছে নির্মম সেই হত্যাকা-ের নিদর্শন। বছর ঘুরে আজ আবার এসেছে বেদনাবিধুর সেই ১৫ আগস্ট। তবে এবার এক নতুন প্রেক্ষাপটে পালিত হচ্ছে জাতির জনকের শাহাদাতবার্ষিকী।






অবৈধ ৰমতা দখল চিরতরে রদকল্পে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে মহান জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতির চির অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটানো হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে উদ্ভাসিত হয়ে সংবিধান থেকে অপরাজনীতির অগণতান্ত্রিক স্বৈর ধারাকে অপসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতিগত কলঙ্ক মোচনের আরেকটি মাইলফলক হিসেবে স্বাধীনতাবিরোধী, জাতিদ্রোহী, দেশদ্রোহী, স্বদেশের মুক্তিকামী মানুষের বির্বদ্ধে ভিনদেশী ঔপনিবেশিক দখলদারদের পক্ষাবলম্বনকারী অর্থাৎ মানবতার বির্বদ্ধে অপরাধী ’৭১-এর নরঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুর্ব হয়েছে। নতুন এই প্রেক্ষাপটে শোককে শক্তিতে পরিণত করার নতুন প্রেরণায় ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে জাতীয় শোক দিবস। জাতি আজ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে শপথ নেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এ উপলক্ষে গ্রহণ করেছে নানা কর্মসূচি। জাতীয় শোক দিবসে সকল সরকারি ও বেসকারি ভবন এবং বিদেশী দূতাবাসগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিলৱুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে পৃথক বাণী দিয়েছেন।



’৭১ সালের মহান স্বাধীনতা একদিকে যেমন বাঙালি জাতির জীবনে নতুন এক আস্বাদ এনে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি স্বাধীন দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের পরিবর্তন প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা, সমৃদ্ধির লক্ষ্যে গ্রহণ করেছিলেন নানা উদ্যোগ। বঙ্গবন্ধুর গৃহীত পদক্ষেপসমূহ সদ্য স্বাধীন দেশকে যখন দ্র্বত উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তখনই শুর্ব হয় ষড়যন্ত্র। আন্তর্জাতিক কুচক্রী ও ষড়যন্ত্রকারীদের একটি গোষ্ঠী, সেনাবাহিনীর ক্ষমতালিপ্সু কতিপয় সদস্য এবং সর্বোপরি দুর্নীতিগ্রস্ত মুনাফালোভী কিছু ব্যক্তি এই বজ্রকণ্ঠ অমিততেজী নেতাকে অপসারণের নীলনকশা প্রণয়ন করে। তারা বুঝতে পেরেছিল বঙ্গবন্ধুকে বাংলার মাটিতে জীবিত অবস্থায় অপসারণ সম্ভব নয়। আর তা না হলে তাদের শেষ পর্যন্ত এই দেশ ছাড়তে হবে। একইভাবে আন্তর্জাতিক তাঁবেদারিতে অনভ্যস্ত বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিরূপ ও নাখোশ মহলও শামিল হয়েছিল নির্মম হত্যাযজ্ঞের নকশা প্রণয়নে। এরই জের ধরে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত লাশ ডিঙিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলেন তারই দলের একটি অংশ। খন্দকার মুশতাক সেই ষড়যন্ত্রীদেরই প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। এই নির্মম হত্যাকা-ের বিচার যাতে না করা যায় সেই কুখ্যাত ইনডেমনিটিও জারি করেছিলেন। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই কাকডাকা ভোরে কী ঘটেছিল আজ সারা পৃথিবীজুড়ে তা রক্তাক্ত দলিল হয়ে আছে। যে ষড়যন্ত্রময় রাজনীতির রক্তবীজ রোপিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে, আজ তা বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। আজো অব্যাহত আছে সেই ষড়যন্ত্রের জাল বোনা। বাঙালির ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার জন্য অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। ঘটানো হয়েছে ইতিহাসের নির্লজ্জ বিকৃতি। কিন্তু বাঙালির হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলা যায়নি। শোকাবহ আগস্টে সমগ্র জাতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে আওয়ামী লীগ, সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বেদনাবিধুর পরিবেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় শোক দিবস স্মরণ ও পালন করছে। যথাযোগ্য মর্যাদা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে এই উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে শিশু, নর-নারী, আবালবৃদ্ধবনিতা, সকল শ্রেণী-পেশার শোকাহত মানুষের ঢল নামছে। সমগ্র জাতি শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান স্থপতি, রাষ্ট্রপিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সকল শহীদ সদস্যবর্গকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারবর্গের হত্যাকা-ের বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে। মানবতার শত্র্ব, ঘৃণ্য নরপিশাচ ৫ আত্মস্বীকৃত খুনির ফাঁসির দ-াদেশ কার্যকর হয়েছে। বিদেশে পলাতক বাকি খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে সর্বোচ্চ আদালতের রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। যারা এক সময় নিজেদের বিচারের ঊর্ধ্বে ভেবেছিল এবং কেউ তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না বলে দম্ভ করেছিল, এই বিচার ও দ-াদেশ কার্যকর করার ভেতর দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে বাংলার মাটিতে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যে যতো ক্ষমতাধরই হোক না কেন, ইতিহাসের অমোঘ বিধানানুযায়ী শাস্তি ভোগ থেকে খুনিরা কেউই রেহাই পাবে না। এছাড়াও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে নস্যাৎ করার পাশাপাশি হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের অপরাজনীতি চালু হয়েছিল।



রাতের অন্ধকারে বন্দুকের নল উঁচিয়ে সংবিধান পদদলিত করে অবৈধ পথে ক্ষমতা দখল ও দখলিকৃত ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করার জন্য সংবিধান পরিবর্তনের অশুভ ধারা সূচিত হয়েছিল। তা চিরতরে রদকল্পে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে মহান জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতির চির অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটানো হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে উদ্ভাসিত হয়ে সংবিধান থেকে অপরাজনীতির অগণতান্ত্রিক স্বৈরধারাকে অপসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতিগত কলঙ্ক মোচনের আরেকটি মাইলফলক হিসেবে স্বাধীনতাবিরোধী, জাতিদ্রোহী, দেশদ্রোহী, স্বদেশের মুক্তিকামী মানুষের বির্বদ্ধে ভিনদেশী ঔপনিবেশিক দখলদারদের পক্ষাবলম্বনকারী অর্থাৎ মানবতার বির্বদ্ধে অপরাধী ’৭১-এর নরঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুর্ব হয়েছে। উলিৱখিত পটভূমিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহতী আদর্শ তথা শ্রেণী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গরিব, দুঃখী সাধারণ সকল মানুষের উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সুখী-সমৃদ্ধ প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্র বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুর রক্তঋণ পরিশোধে বাঙালি জাতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই জাতির জনকের ৩৬তম শাহাদাতবার্ষিকীতে সকলের সম্মিলিত শপথ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের লৰ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গৃহীত দিনবদলের কর্মসূচি তথা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নয়ন, গণতন্ত্র, শান্তি ও প্রগতির পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। আওয়ামী লীগের কর্মসূচি জাতীয় শোক দিবস উপলৰে আজ সোমবার সূর্য উদয় ক্ষণে বঙ্গবন্ধু ভবন এবং দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সংগঠনের সকল স্তরের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন। সকাল সাড়ে ৬টায় ধানম-ির বঙ্গবন্ধু জাদুঘর প্রাঙ্গণে রক্ষিত জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধনামন্ত্রীর পুষ্পস্তবক অর্পণ, সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনার প্রদান এবং মোনাজাত অনুষ্ঠানে যোগদান। সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। (ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নগরীর প্রতিটি শাখা থেকে শোক মিছিলসহ বঙ্গবন্ধু ভবনের সম্মুখে আগমন এবং শ্রদ্ধা নিবেদন)।



সকাল সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিল। সকাল সোয়া ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত এবং দুপুর দেড়টায় মিলাদ ও বিশেষ দোয়া মাহফিল (বাদ জোহর)। টুঙ্গিপাড়ার কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও কাজী জাফর উলৱাহ, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীর নানক, বি এম মোজাম্মেল হক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ শেখ মোহাম্মদ আব্দুলৱাহ, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফার্বক খান, শ্রম ও জনশক্তি বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আলতাফ হোসেন, শেখ হার্বন অর রশিদ, সৈয়দা জেবুন্নেছা হক, বেগম মন্নুজান সুফিয়ান ও শ্রী সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধে অনুষ্ঠিতব্য আওয়ামী লীগের সকল কর্মসূচিতে তার সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া, সকাল ১১টায় মহিলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। সকাল ৮টায় মিরপুর গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠান। সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠান। বিকাল ৪টায় মের্বল বাড্ডা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারে প্রার্থনা অনুষ্ঠান। বাদ আছর দেশের সকল ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় মিলাদ মাহফিল ও ইফতার। ১৬ আগস্ট মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভায় সভাপতিত্ব করবেন দলের প্রেসিডিয়াম ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেবেন জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা। সৈয়দ আশরাফের আহ্বান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আজ ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩৬তম শাহাদাতবার্ষিকী জাতীয় শোক দিবস যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পালন করার জন্য দল ও সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সংস্থাসমূহের সকল স্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সকল জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ সকল শাখার নেতৃবৃন্দকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করে দিবসটি স্মরণ ও পালন করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।




৩৬ বছর আগে এইদিনে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বড় ছেলে শেখ কামাল, মেজো ছেলে শেখ জামাল, ছোট ছেলে শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের ও পুলিশের বিশেষ শাখার সাব ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সেই রাতে আরও নিহত হন বঙ্গবন্ধুর বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবী ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকটাত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত, রিন্টু ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল। তখন থেকেই আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি সমমনা রাজনৈতিক দল ও সংগঠন দিনটি পালন করে আসছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৫ আগস্ট প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারও ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন করে। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ক্ষমতায় এসে দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত বাতিল করে। এছাড়া জাতীয় পতাকা বিধি সংশোধন করে সরকার নির্ধারিত দিন ছাড়া জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এরপর থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসূচির মধ্য দিয়েই দিনটি পালিত হয়ে আসছিল। ২০০৮ সালে হাইকোর্ট এক রায়ে ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। সরকারও সে অনুযায়ী দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৫ আগস্ট ছুটির দিন ঘোষণা করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ বলে পরিচিত শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগ গঠনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসেন। এরপর '৫২-র ভাষা আন্দোলন, '৫৪-তে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, '৬৬-তে ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা এবং '৬৮-তে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। ১৯৬৯-এ ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করে তাকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) বিপ্লবী কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার চূড়ান্ত ডাক- 'এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম- আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম' জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে এবং ঐক্যবদ্ধ হতে প্রেরণা যোগায়। তার নেতৃত্বেই দীর্ঘদিনের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

Wednesday, August 10, 2011

বিশ্বের সেরা নারী নেত্রীদের তালিকায় শেখ হাসিনা



বিশ্বের সেরা নারী নেত্রীদের তালিকায় শেখ হাসিনা






বিশ্বের শীর্ষ ১২ নারী নেত্রীর একজন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনলাইন টাইম ম্যাগাজিন গত ৫ আগস্ট ওইসব নেত্রীর একটি তালিকা প্রকাশ করে। এতে ৭ নম্বরে ঠাঁই পেয়েছেন শেখ হাসিনা। তালিকার ১ নম্বর অবস্থানে রয়েছেন থাইল্যান্ডের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যানজেলা মারকেল। ৩ নম্বরে রয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিনা ফার্নান্দেজ ডি কিশ্চেনার। টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এ বিষয়ক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘টপ ১২ ফিমেল লিডারস এরাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’। অনলাইন নিউজ এজেন্সি ইউকে বিডিনিউজ এ তথ্য জানায়। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ (৬৩) আওয়ামী লীগের নেত্রীও। তার বেঁচে থাকাটাও একটি ইতিহাস।


১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের সময় তার পরিবারের ১৭ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল। ওই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা হারিয়েছেন তার তিন ভাই, মা ও পিতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে। তখন শেখ হাসিনার বয়স ২৮ বছর। তিনি ছিলেন বিদেশে। এজন্য তিনি প্রাণে বেঁচে যান। পরে তিনি দেশে একটি গ্রেনেড হামলায় বেঁচে যান। ওই হামলায় কমপক্ষে ২০ জন নিহত হয়েছেন। ওই হামলায় বুলেটে তার গাড়ি ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল।


১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০০১ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে অভিহিত করে। এর পরের নির্বাচনে শেখ হাসিনা ভূমিধস হেরে যান। তবে তার গতি থেমে থাকেনি।


২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদের ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৩০ টিতেই বিজয়ী হয়। ফের তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা ফিরে পান। ওই তালিকায় আরো নাম রয়েছে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা র্বশেফ, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড, লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইলেন জনসন শিরলিফ, আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী য়োহানা সিগুরদারডোত্তি, কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট লরা সিনসিলা, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট তারজহা হালোনেন, লিথুয়ানিয়ার প্রেসিডেন্ট ডালিয়া গ্রিবুউসকাইতি এবং ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোর প্রধানমন্ত্রী কামলা পেরসাদ বিসেসার।

Thursday, June 23, 2011

৬৩ বছরে আওয়ামী লীগ

৬৩ বছরে আওয়ামী লীগ



আওয়ামী লীগের ৬২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২৩ জুন।


১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' প্রতিষ্ঠিত হয়।

দলটি বৃহস্পতিবার ৬৩ বছরে পা রাখতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, "ছয় দশকেরও বেশি কাল ধরে পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ম্ুিক্তযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক এবং সাধারণ মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের সুমহান গৌরব অর্জন করেছে।" তিনি আওয়ামী লীগ গঠনে এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদন স্মরণ করেন। প্রতিষ্ঠাবাষির্কী উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে রঙিন পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড টানানো হয়েছে। ২৩ জুন (বৃহস্পতিবার) ভোরে বঙ্গবন্ধু ভবন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল সাড়ে ৭ টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করবেন দলের শীর্ষ নেতারা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা আওয়ামী লীগের।
যেভাবে প্রতিষ্ঠা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চা এবং অসা¤প্রদাায়িক চেতনার ধারাবাহিকতায় সংগঠনটির নাম থেকে পরে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি হন আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান।



শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থাতেই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। অন্যদিকে, পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এর সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার মুকুল প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। এরপর, ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর তিনি দলটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

আওয়ামী লীগই ছিলো তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল। জন্মলগ্ন থেকেই দলটি প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। পাকিস্তান আমলের গোড়ার রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি, একজনের এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দু'অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য বিলোপ ছিল দলটির প্রধান দাবিগুলোর অন্যতম। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে আওয়ামী মুসলিম লীগ মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর দলটি কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টি মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে।

১৯৫৪ সালের মার্চের মাসের আট থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়।

এরমধ্যে, ১৪৩টি পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ।

২৪ বছরের পাকিস্তান শাসনামলে আওয়ামী লীগ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে দু'বছর প্রদেশে ক্ষমতাসীন ছিল এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ১৩ মাস কোয়ালিশন সরকারের অংশীদার ছিল।

ধর্মনিরপেক্ষ ও অসা¤প্রদায়িক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে ১৯৫৫ সালের ২১ থেকে ২৩ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত দলের তৃতীয় সম্মেলনে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। সংকট ও গণ আন্দোলন পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৫৭ সালে দল ভাঙনের ফলে আওয়ামী লীগ সংকটে পড়ে। ওই বছরের সাত ও আট ফেব্র"য়ারি কাগমারি সম্মেলনে দলে বিভক্তির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৬৬ সালের ফেব্র"য়ারিতে লাহোরে বিরোধী দলের সম্মেলনে তিনি ছয় দফা উপস্থাপন করেন। এর জবাবে আইয়ুব সরকার তাকেসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। এর প্রেক্ষিতে ১৯৯৬তে গণআন্দোলন শুরু হয় এবং আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ওই বছরের ২২ ফেব্র"য়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্তে মুক্তি দেয় পাকিস্তান সরকার।

পরদিন তৎকালীন রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়াদী উদ্যান) সংবর্ধনায় তাকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি দেয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

গণআন্দোলন ও আইয়ুবের পতনের পটভূমিতে '৭০ এর নির্বাচনে কেন্দ্রিয় আইনসভায় (জাতীয় পরিষদ) পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টির মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০ আসনে জয়ী হয়।

অন্যদিকে প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন পায় দলটি। জাতীয় পরিষদের সাতটি মহিলা আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের দশটি মহিলা আসনের সবগুলোতেই জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে আমন্ত্রণ জানানোর পরিবর্তে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালির অধিকার নস্যাৎ করার পথ বেছে নেয়। ৭১'র মার্চে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগের ডাকে জনগণ সর্বাত্মকভাবে সাড়া নেয়। ২৫ মার্চ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী।

বঙ্গবন্ধুকে আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন থেকেই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত প্রবাসী সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে। তিন মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ তিন মেয়াদে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। ১৯৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় আওয়ামী লীগকে। এরমধ্যে ১৯৭৩ সালে নতুন সংবিধানের অধীনে সাধারণ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসন লাভ করে দলটি।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে একটি মাত্র জাতীয় দল 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) গঠনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের বিলুপ্তি ঘটানো হয়।

'৭৫ এর ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর সামরিক সরকার রাজনৈতিক দল প্রবিধান ঘোষণা করলে ১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন ঘটে। আওয়ামী লীগ সম্মেলন করে প্রবাসে থাকা বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে দলের দায়িত্ব নেন। এর আগে, জিয়াউর রহমানের অধীনে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসনে জয় লাভ করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ '৮৬ সালে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে ৭৬টি আসন পায়। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৮৮ আসনে জয়ী হয়ে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করে।
'৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন শুরু করে। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই আওয়ামী লীগ একই বছর সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৪৬টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ চারদলীয় জোটের কাছে পরাজিত হয়ে ফের বিরোধী দলে চলে আসে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে চারদলীয় জোটের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দলীয়করণের অভিযোগ, নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা, ১১ জানুয়ারি ক্ষমতায় পালাবদল ও বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আওয়ামী লীগের সমর্থন, পরবর্তীতে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার ও চিকিৎসার জন্য ১১ জুন সাময়িক মুক্তি সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়েও বেশ চড়াই উতড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে আওয়ামী লীগ।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট বিপুল বিজয় অর্জন করে। ৩০০ আসনের মধ্যে এককভাবে আওয়ামী লীগ পায় ২৩৩টি আসন। পরে, আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে দলটির নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

Monday, May 16, 2011

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ



শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস



আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ ১৭ মে।



দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের এই দিনে তিনি দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানবতার শত্র" ঘৃণ্য ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। ঐ সময়ে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় ঘাতকদের নির্মমতার হাত থেকে রেহাই পান। ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্র"য়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস-বায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার, স্বৈরতন্ত্রের চিরঅবসান ঘটিয়ে জনগণের হৃত গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সার্বভৌম সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়।১৭ মে ১৯৮১ সাল; সারা দেশের গ্রামগঞ্জ, শহর-বন্দর থেকে লাখ লাখ অধিকারবঞ্চিত মুক্তিকামী জনতা সেদিন ছুটে এসেছিল রাজধানী ঢাকায়। স্বাধীনতার অমর স্লোগান ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়েছিল ঢাকার আকাশ-বাতাস।


জনতার কণ্ঠে বজ্রনিনাদে ঘোষিত হয়েছিল ‘হাসিনা তোমায় কথা দিলাম-পিতৃ হত্যার বদলা নেবো’। ‘শেখ হাসিনার আগমন, শুভে"ছা স্বাগতম’, ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিল রাজধানী শহর ঢাকা।বস'ত, ১৭ মে ১৯৮১ আবারো প্রমাণিত হয়েছিল, ‘মুজিব বাংলার, বাংলা মুজিবের’। লাখো জনতার প্রাণঢালা উষ্ণ সম্ভাষণ এবং গোটা জাতির স্নেহাশীষ ও ভালোবাসার ডালা মাথায় নিয়ে প্রিয় স্বদেশভূমিতে ফিরে এসেছিলেন জনতার আশীর্বাদধন্য নেত্রী, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন গগন বিদারী মেঘ গর্জন, ঝঞ্ঝা-বিড়্গুব্ধ প্রকৃতি যেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বদলা নেয়ার লড়্গ্যে গর্জে উঠেছিল, আর অবিরাম মুষলধারে বারি-বরষণে যেন ধুয়ে-মুছে যা"িছল বাংলার মাটিতে পিতৃহত্যার জমাট বাঁধা পাপ আর কলঙ্কের চিহ্ন। ঝড়-বাদল আর জনতার আনন্দাশ্র"তে অবগাহন করে শেরে বাংলা নগরে লাখ লাখ জনতার সংবর্ধনার জবাবে শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেলসহ সকলকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদেরকে ফিরে পেতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তা বাস-বায়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে চাই, বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ফলে দেশে গণ-জাগরণের ঢেউ জাগলো, গুণগত পরিবর্তন সূচিত হলো আন্দোলনের, সংগঠনের সঙ্গে নতুন করে গণসম্পৃক্ততা সৃষ্টি হলো ব্যাপকভাবে। দেশবাসী নতুন আলোর দিশা পেলো। সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা, স্বৈরাচারবিরোধী মুক্তি আন্দোলন এবং গণমানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রামী ইতিহাসের নতুন দিগন- উন্মোচিত হলো সেদিন থেকে।দেশে ফেরার পর থেকেই শেখ হাসিনা নিরলসভাবে দেশের অধিকারহারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরব"িছন্ন লড়াই সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। এদেশের অধিকারহারা মানুষের মুক্তির লড়্গ্যে আন্দোলন সংগ্রাম করার ‘অপরাধে’ তাকে বারবার ঘাতকদের হামলার শিকার ও কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। জনগণের ভালোবাসায় অভিষিক্ত হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়ে তিনি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং সকল শ্রেণী ও পেশার জনগণের কল্যাণে যুগান-কারী অবদান রেখে চলেছেন। দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন কবলিত জীর্ণ বাংলাদেশকে তিনি একটি উন্নত আধুনিক অসামপ্রদায়িক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার সংগ্রামে নিয়োজিত রয়েছেন।

Sunday, May 1, 2011

সংবিধানের মূল স-ম্ভগুলো কোনভাবেই পরিবর্তনযোগ্য নয় : প্রধান বিচারপতি



সংবিধানের মূল স-ম্ভগুলো কোনভাবেই পরিবর্তনযোগ্য নয় : প্রধান বিচারপতি




মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, আদর্শ ও চিন-াধারা মাথায় রেখে সংবিধান সংশোধন করার পরামর্শ দিয়েছেন


প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়র"ল হক






তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের কথা চিন-া করতে হবে লাখো মুক্তিযোদ্ধা, লাখো শহীদের কথা মাথায় রেখে। শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন-র্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে নবীন আইনজীবীদের সনদ বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। বার কাউন্সিলের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়র"ল হক বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কোনভাবেই পরিবর্তনযোগ্য নয়। বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতি থেকে যেন সামান্যতম পদস্খলন না হয়। এছাড়া বিচারপতিদের অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) বিষয়েও কথা বলেন তিনি। বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মজুমদার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে প্রায় দেড় হাজার আইনজীবীকে সনদ প্রদান করা হয়।



প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়র"ল হক বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন ১৯৭১ সালে লাখো শহীদ। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, জীবন দিয়েছেন তাদের রক্তের আকরে আমাদের সংবিধান লেখা হয়েছে। সেই মুক্তিবাহিনী যারা নিজের জীবন বাজি রেখে এই বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে নিয়ে এসেছে, এই মুক্তিবাহিনী যারা আমাদের দেশবাসীকে একটা পতাকা উপহার দিয়েছে, পৃথিবীর বুকে একটা স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে জন্ম দিয়েছে। একটা মানচিত্র ও জাতীয় সংগীত উপহার দিয়েছে। যখনই আমরা আমাদের সংবিধান সংশোধনের কথা চিন-া করব, আমরা যেন সেই লাখো মুক্তিযোদ্ধা, লাখো শহীদের কথা চিন-া করি ও মাথায় রাখি। তারা কী চিন-া করে, কী উদ্দেশ্যে কোন স্বপ্নে এই বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিলেন, সেটা আমাদের ভাবতে হবে। এই বাংলাদেশ লাখো মুক্তিযোদ্ধার সৃষ্টি। এগুলোর প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অন্য কোনভাবে নয়। আমরা তাদের আত্মত্যাগের সুবিধাভোগী (বেনিফিশিয়ারি) মাত্র। প্রধান বিচারপতি বলেন, ’৭২ সালে যে বেসিক প্রিন্সিপালের (মূলনীতি) আমাদের পূর্বপুর"ষরা চিন-ায় রেখেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধারা চিন-ায় রেখেছিলেন, সেই বেসিক প্রিন্সিপাল থেকে এতটুকু পদস্খলন আমাদের কাম্য নয়। আমাদের বেসিক স্ট্রাকচার (মৌলিক কাঠামো) অবশ্যই পরিবর্তনযোগ্য নয়। সংবিধানের বেসিক কাঠামো কেউই পরিবর্তন করতে পারে না। ইমপিচমেন্ট অব দ্য জাজেস (বিচারপতিদের অভিশংসন) প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়র"ল হক বলেন, সংসদ সদস্যরা, পাল্টার্মেন্ট এ ব্যাপারে কী সিদ্ধান- নেবেন-এটা তাদের ব্যাপার। তাদের ব্যাপারে আমার কোন বক্তব্য নেই। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তারা যে কোন সিদ্ধান- নিতে পারেন। তবে এর একটু ইতিহাস আছে।



ইমপিচমেন্ট কিভাবে হল, এটাও জানা দরকার। মুঘল আমলে কিংবা যে কোন সময়ে সম্রাট, রাজা-বাদশা বা কিং তারা তাদের খুশিমতো কাজী, বিচারক, বিচারপতি নিয়োগ করতেন এবং খুশিমতো তাদের বরখাস- (ডিসমিস) করতেন। রাজারা তাদের খুশিমতো নিয়োগ দিতে পারতেন এবং খুশিমতো, এমনকি কোন নোটিশ ছাড়াই এক সেকেন্ডের কথায় তাদের গর্দানও চলে যেতে পারত।



স্যার থমাস ম্যুর এর একটা উদাহরণ। স্যার এডওয়ার্ড কুকের উদাহরণ টেনে প্রধান বিচারপতি বলেন, ১৬১৭ সালে তিনি বরখাস- হন প্রথম কিং জেমস দ্বারা। সেই সময় রাজাদের এক"ছত্র ক্ষমতা ছিল। এরপর এলো অ্যাক্ট অব সেটেলমেন্ট ১৭০১। এই প্রথম ঠিক হল, না, রাজার খুশিমতো বিচারকদের অব্যাহতি দেয়া সম্ভব নয়। বিচারকদের যদি উনি একবার নিয়োগ দেন, তাহলে তিনি কোন বিচারপতিকে বরখাস- করতে পারবেন না। যদি না কোন সুনির্দিষ্ট অসদাচরণের অভিযোগ না থাকে। সেটা কে দেখবে? দেখবে সংসদ। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি ইমপিচমেন্টের পক্ষে থাকে, তাহলে একজন সুপিরিয়র কোর্টের জাজকে ইমপিচ করা যাবে, অন্যথায় নয়। এই প্রথম রাজার ক্ষমতা থেকে প্রজাদের মধ্যে ক্ষমতাটা চলে এলো। এর ইতিহাস এজন্য গুর"ত্বপূর্ণ যে সেই সময় রাজার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই হাউস অব পার্লামেন্ট এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছিল। এভাবেই ইমপিচমেন্টের অধিকারটা সংসদের হাতে আসে। একজন বিচারপতিকে ক্ষতিগ্রস- করার জন্য নয়। বরং বিচারপতিদের রক্ষা করার জন্য রাজার দ্বারা ক্ষতিগ্রস- হওয়া থেকে রক্ষার জন্য।



প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়র"ল হক বলেন, যে কোন বিচারক বা বিচারপতির বড় অস্ত্র হ"েছ জনগণের আস্থা। জনগণের আশা-ভরসার স'ল হ"েছন বিচারপতিরা। এটা সেই ১৭০০ ও ১৮০০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ বুঝত। আজও সর্বত্রই বোঝে। বিচারকদের নিয়ে, বিচারব্যবস'া নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। কিন' তার পরও কিন' সবাই বিচারালয়েই আসে। বিচারকদের কাছেই আসে। এর কারণ হ"েছ, এখনও বিচারকরা জনগণের আস'া হারাননি। এখনও মানুষ মনে করে, সুপ্রিমকোর্ট বা জেলা আদালতে আমরা ন্যায়বিচার পাব। প্রধান বিচারপতি প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, জনগণের এ আস'া আমরা কিছুতেই অবসান হতে দেব না। বিচারকদের প্রধান দায়িত্ব হ"েছ ন্যায়বিচার কায়েম করা। আজকাল প্রায়ই আমি কথাটা শুনি, রিলিফ দিতে হবে। রিলিফ দেয়াটা কোন বিচারকের দায়িত্ব নয়। তাদের দায়িত্ব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ব্যক্তিগত চিন-াধারা কোনভাবেই যেন বিচারিক চিন-াকে প্রভাবিত না করে সেটা দেখার দায়িত্ব বিচারপতিদের, বিচারকদের এবং সে ব্যাপারে সর্বোতভাবে সহায়তা করার দায়িত্ব আইনজীবীদের। এখানে উল্লেখ্য, আইন বিশেষজ্ঞদের মত, সংবিধানের সত্তর অনু"েছদের সংশোধন না করে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া হলে তা অর্থবহ হবে না। কারণ সংসদ সদস্যদের নিজেদের ই"ছায় নয়, দলের সিদ্ধানে-ই কোন বিচারপতির অভিশংসনের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দিতে হবে।

Monday, March 21, 2011

স্মরণ:ভাষা সৈনিক কাজী গোলাম মাহবুব

ভাষা সৈনিক কাজী গোলাম মাহবুব
গত ১৯ মার্চ ছিলো ভাষা সৈনিক গোলাম মাহবুবের ৫ম মৃতু্যবার্ষিকী। ২০০৬ সালের এ দিনে তিনি ৭৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। গোলাম মাহবুব ১৯৫২ সালের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। একজন প্রবীণ আইনজীবী হিসাবে তিনি ১৯৯৩ সালে সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন।আমাদের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে কাজী গোলাম মাহবুবের অবদান অবিস্মরণীয়। ছাত্রলীগের নেতা হিসাবে তিনি ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। সে বছর ১১ মার্চ প্রথম গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে। সেদিন সচিবালয়ে পিকেটিংকালে সহকর্মীদের নিয়ে তিনি রাস্তায় আইজি'র গাড়ির সামনে শুয়ে ব্যরিকেড দেন। এ কারণে তাকে বর্বরোচিত পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং সে অবস্থায়ই তাকে করা হয় গ্রেফতার। ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা চুক্তি সত্ত্বেও তিনি মুক্তি পাননি। ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাকে ও অন্যান্য রাজবন্দিদের ছাড়া জেল থেকে বের হবেন না বলে ঘোষণা দেন। এ অবস্থায় সরকার তাদেরকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ৩১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে বার লাইব্রেরির সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিভাবে এর আহ্বায়ক হলেন কাজী গোলাম মাহবুব। ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচি তার নেতৃত্বে সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি লাঠিচার্জে আহত ছাত্রদের সাহায্যার্থে এগিয়ে যেতে তিনি ভয় পাননি। এরপর গ্রেফতার এড়িয়ে আন্দোলন পরিচালনার কৌশল অবলম্বন করেন। একুশের ঘটনাবলী সম্পর্কে তৎকালীন পূর্বপাক প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীনের বেতার ভাষণের তীব্র প্রতিবাদকারী হিসাবে তিনি বিবৃতি প্রদান করেন। একুশের রাতে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বুয়েট) সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক ডাকেন। এতে নতুন করে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং সিদ্ধান্ত হয়, লাগাতার হরতাল চলবে। এ সময় তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। এরপর গোলাম মাহবুব আত্মগোপন করে আন্দোলন চালিয়ে যায়। ৭ মার্চ ঢাকার শান্তিনগরে নেতৃবৃন্দের বৈঠকে চলাকালে পুলিশ বাড়িটি ঘেরাও করে এবং সাতজন নেতা গ্রেফতার হন। গোলাম মাহবুব কৌশলে গ্রেফতার এড়িয়ে গভীর রাতে অন্য জায়গায় চলে যান। এরপর যান ফরিদপুর। ২৯ মার্চ আইনজীবীর পরামর্শে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে যান আইনের আশ্রয় নিতে। সেখানে তাকে বন্দি করে কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয় এক বছর। এম আর মাহবুব

Wednesday, March 16, 2011

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন


বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯১তম জন্মদিন বৃহস্পতিবার। এ দিনটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এদিন সরকারি ছুটি। চলতি বছর এ দিবসের প্রতিপাদ্য- 'বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নদেশ, দিন বদলের বাংলাদেশ'। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান ও মোসাম্মৎ সায়রা বেগমের সংসারে জন্ম নেন শেখ মুজিবুর রহমান। চার মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে মুজিব ছিলেন তৃতীয়। কালক্রমে মুজিব পরিণত হন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায়। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে তিনি পরিচিত হন 'বঙ্গবন্ধু' হিসেবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে হয়তো বাংলাদেশের জন্ম হতো না। বাঙালি জাতির ইতিহাসে তার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের শোষিত মানুষের অধিকার আদায় ও মুক্তির প্রতিভূ। প্রকৃত ইতিহাস জানতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বাঙালির স্বার্থের ব্যাপারে আপসহীন এই নেতা সহকর্মীদের নিয়ে ১৯৪৮ সালে গঠন করেন ছাত্রলীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নবগঠিত দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরে অসা¤প্রদায়িক চেতনায় আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নামকরণ হয় আওয়ামী লীগ। তার নেতৃত্বে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয় বাঙালি। এ জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের দীর্ঘ পরিক্রমায় বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে এই নেতাকে। ১৯৬৯ এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা তাকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি দেয়। ১৯৭০ এর নির্বাচনে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের ম্যান্ডেট পায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নির্বাচনে বাঙালির এ বিজয়কে মেনে নেয়নি। এরপর স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির আন্দোলন নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ নেয়। ১৯৭১ এর মার্চে শুরু হয় অসহযোগ।

ওই বছর ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, 'এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। একাত্তরে নয় মাস যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়। ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিজ বাসভবনে ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হন তিনি।

Wednesday, February 23, 2011

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও বঙ্গবন্ধু



ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও বঙ্গবন্ধু



তোফায়েল আহমেদ




প্রতি বছর ২৩ ফেব্র"য়ারি দিনটি আমি গভীরভাবে স্মরণ করি। এ দিনটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্র"য়ারি ইতিহাসের মহামানব, বাংলার মুকুটহীন সম্রাট জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। প্রিয় নেতা তার যৌবনের চৌদ্দটি মূল্যবান বছর পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছিলেন। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে যে নেতা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলার ছবি হূদয় দিয়ে এঁকেছিলেন, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন, সেই নেতাকেই সেদিন জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেছিলাম। তিনি শুধু বাঙালি জাতিরই মহান নেতা ছিলেন না, সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা ছিলেন। পাকিস-ান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এ পাকিস-ান বাঙালিদের জন্য হয়নি। একদিন বাঙালিকে বাংলার ভাগ্যনিয়ন-া হতে হবে। সে লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে ১৯৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করে ১৯৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারপর সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথে নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৬৮-৬৯ এক গৗরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কারণ ওই কালপর্বটি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ‘ড্রেস রিহার্সেল।’ বাঙালি জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা দেয়ার অপরাধে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সর্বমোট ৩৫ জনকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করে তাদের ফাঁসি দিয়ে নির্বিঘ্নে পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের এক ঘৃণ্য মনোবাসনা চরিতার্থে ষড়যন্ত্রের জাল বিস-ার করে আইয়ুব খান এগো"িছল। আগরতলা মামলার বিচার যখন শুর" হয় তখন আমরা উপলব্ধি করি, বঙ্গবন্ধুকে যদি ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয় তাহলে চিরদিনের জন্য বাঙালি জাতির কণ্ঠ স-ব্ধ হয়ে যাবে। তাই আমরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১৯৬৯-এর ৫ জানুয়ারি ১১ দফা কর্মসূচি জাতির সামনে পেশ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ‘ডাকসু’ কার্যালয়ে আমার সভাপতিত্বে এবং চার ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপসি'তিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ১১ দফা ঘোষণা করা হয়। ৮ জানুয়ারি সম্মিলিত বিরোধী দল সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ৮টি বিরোধী দলের ঐক্যফ্রন্ট কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ দফাভিত্তিক এক ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। ৯ জানুয়ারি দেশের ৮টি বিরোধী রাজনৈতিক দলের ঐক্যের ভিত্তিতে উবসড়পৎধঃরপ অপঃরড়হ ঈড়সসরঃবব সংক্ষেপে ‘ডাক’ গঠন করে। ১২ জানুয়ারি ডাক প্রাদেশিক সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৮ দফা দাবির ভিত্তিতে ১৭ জানুয়ারি ‘দাবি দিবস’ পালনের সিদ্ধান- গৃহীত হয়। ১৭ জানুয়ারি বায়তুল মোকাররমে ডাক-এর আর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় এবং পূর্ব ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। সেদিনের ব্যাপক পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৮ জানুয়ারি শনিবার ঢাকা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানানো হয়। ১৮ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সফল ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সকালে বটতলায় ছাত্র জমায়েতের পর খণ্ড খণ্ড মিছিল এবং সহস্র কণ্ঠের উ"চারণ- ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, আইয়ুব খানের পতন চাই।’ সন্ধ্যায় জিন্নাহ হলে (বর্তমানে সূর্যসেন হল) ইপিআর কর্তৃক ছাত্রদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ। ১৯ জানুয়ারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল, পুলিশের বাধা ও গুলিবর্ষণ। ২০ জানুয়ারি ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের মাইলফলক। এদিন ১১ দফার দাবিতে ঢাকাসহ প্রদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। মিছিলে পুলিশের গুলিতে আসাদের মৃত্যু হয়। শহীদ মিনারের সামনে অনুষ্ঠিত শোকসভায় আমার সংক্ষিপ্ত বক্তৃতার পর আসাদের রক্ত ছুঁয়ে আমরা শপথ গ্রহণ করি। ২১ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে শহীদ আসাদের গায়েবানা জানাজা শেষে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে আমি তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করি : ২২ জানুয়ারি শোক মিছিল, কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন; ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মশাল মিছিল, পরে কালো পতাকাসহ শোক মিছিল; ২৪ জানুয়ারি বেলা ২টা পর্যন- হরতাল।
১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে জানাজার পরে লাখো মানুষের মিছিল। ২২ জানুয়ারি ঢাকায় সব বাড়ি আর গাড়িতে কালো পতাকা আর প্রতিটি মানুষের বুকে কালো ব্যাজ। ২৩ জানুয়ারি ঢাকা শহর মশাল আর মিছিলের নগরী। ইতিহাসের বৃহত্তম মশাল মিছিল। ২৪ জানুয়ারি হরতাল। ছাত্র-গণমিছিলে গুলিতে ঢাকার নবকুমার ইন্সটিটিউটের নবম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর রহমানের মৃত্যু। ‘দৈনিক পাকিস-ান’, ‘মর্নিং নিউজ’ এবং ‘পয়গাম’ পত্রিকা অফিসে আগুন। শহীদদের তালিকায় যুক্ত হয় আনোয়ার, র"স-ম, মিলন, আলমগীরসহ আরও অনেক নাম। দুপুরে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় পল্টন ময়দানে। আমার বক্তৃতার পর সেখান থেকে মিছিল জমায়েত হয় ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুর"ল হক হল) মাঠে। সান্ধ্য আইন অমান্য করে রাজপথে লাখো মানুষের ঢল নামে। গণবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয় গণঅভ্যুত্থান। ২৫, ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি সান্ধ্য আইন বলবৎ থাকে। ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে পশ্চিম পাকিস-ানে গণবিক্ষোভ। ১ ফেব্র"য়ারি আইয়ুব খানের বেতার ভাষণ। বিরোধী দল এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রত্যাখ্যান। ৬ ফেব্র"য়ারি আইয়ুবের পূর্ব পাকিস-ান সফর। সংবাদ সম্মেলনে দেশরক্ষা আইন ও অর্ডিন্যান্সের প্রয়োগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান- ঘোষণা।
৮ ফেব্র"য়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের ছাপাখানা নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেসের ওপর থেকে বাজেয়াপ্ত আদেশ এবং দৈনিক ইত্তেফাকের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
৯ ফেব্র"য়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পল্টন ময়দানে ‘শপথ দিবস’ পালন। পরিষদের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র হিসেবে আমার সভাপতিত্বে পল্টন ময়দানে এক বিশাল সমাবেশে ১০ জন ছাত্রনেতা জীবনের বিনিময়ে ১১ দফা দাবি প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প ঘোষণা করেন এবং শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি না হওয়া পর্যন- আন্দোলন অব্যাহত রাখার শপথ গ্রহণ করেন। এই দিন স্লোগান ওঠে ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করবো; শপথ নিলাম শপথ নিলাম মা-গো তোমায় মুক্ত করবো।’
১১ ফেব্র"য়ারি পাকিস-ান প্রতিরক্ষা আইনে ধৃত রাজবন্দিদের বিনাশর্তে মুক্তি লাভ। ১২ ফেব্র"য়ারি পূর্ব পাকিস-ান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের মুক্তি লাভ।
১৪ ফেব্র"য়ারি ‘ডাক’-এর সারা দেশে হরতাল আহ্বান। পল্টনের সভায় জনতা কর্তৃক নুর"ল আমিন ও ফরিদ আহমদ লাঞ্ছিত।
১৫ ফেব্র"য়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুর"ল হককে ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন-রে নির্মমভাবে হত্যা।
১৫ থেকে ২০ ফেব্র"য়ারি পর্যন- সান্ধ্য আইন জারি। আইয়ুব খানের ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ প্রত্যাহার এবং প্যারোলে মুক্তি দিয়ে শেখ মুজিবসহ বিরোধী নেতৃবৃন্দকে গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ। ছাত্র-জনতা কর্তৃক প্যারোলে মুক্তির প্রস-াব প্রত্যাখ্যান।
১৬ ফেব্র"য়ারি দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে ঢাকা। বাংলা একাডেমী সংলগ্ন স্টেট হাউসে অগ্নিসংযোগ। পল্টনে লক্ষাধিক লোকের অংশগ্রহণে সার্জেন্ট জহুর"ল হকের গায়েবানা জানাজা।
১৭ ফেব্র"য়ারি সারাদেশে পূর্ণ দিবস হরতাল পালন।
১৮ ফেব্র"য়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের রিডার শামসুজ্জোহাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে পাকিস-ানি সেনাদের বেয়োনেট চার্জ করে নির্মমভাবে হত্যা।
২০ ফেব্র"য়ারি বিকাল ৫টায় সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার।
২১ ফেব্র"য়ারি শহীদ দিবসে আমার সভাপতিত্বে পল্টনের মহাসমুদ্রে সংগ্রামী ছাত্র সমাজের অগ্রনায়কদের সংগ্রামী শপথ এবং শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম প্রদান। সমগ্র দেশ গণবিস্ফোরণে প্রকম্পিত। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্র"য়ারি আইয়ুব শাহী সব রাজবন্দিকে বিনা শর্তে মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।বস'ত,
১৯৬৬-এর ৮ মে’র গভীর রাতে ৬ দফা কর্মসূচি প্রদানের অভিযোগে দেশরক্ষা আইনে যে মুজিব গ্রেফতার হয়েছিলেন, ৩৩ মাস পর ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্র"য়ারি যে মুজিব মুক্তি লাভ করেন- নাম বিচারে এক হলেও, বাস-বে ওই দুই মুজিবের মধ্যে ছিল গুণগত ফারাক। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো। সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্ত মানব হয়ে বেরিয়ে আসেন। ২২ তারিখ আমরা ইকবাল হলের প্রভোস্টের কক্ষে সারা রাত সভা করি। অনেক প্রস-াব এসেছিল গণসংবর্ধনার- মওলানা ভাসানী, মনি সিংহ, জুলফিকার আলী ভুট্টো তাদেরও অভ্যর্থনা দেয়ার প্রেসার এসেছিল। কিন' আলোচনা করে সিদ্ধান- নেই, আমরা একজনকেই সংবর্ধনা জানাব। তিনি আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিব। সেই অনুসারেই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ২৩ ফেব্র"য়ারি বিকাল ৩টায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে জনসভার আয়োজন করা হয়।শুর"তেই বলেছি এদিনটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। সেদিনের রেসকোর্স ময়দান যারা দেখেননি তাদের বলে বোঝানো যাবে না সেই জনসমাবেশের কথা। আমরা যখন সেখানে পৌঁছেছি, তখন রেসকোর্স ময়দানে মানুষ আর মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান- থেকে ট্রেন, বাস, ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার বোঝাই হয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছে। ঢাকার মানুষ তো আছেই। অভিভূত হয়ে পড়লাম আমি। এর আগে এত বড় জনসভা আমি দেখিনি। এটা জনসভা ছিল না, ছিল জনসমুদ্র। সেই জনসমুদ্রে লাখ লাখ লোক এসেছে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে এক নজর দেখতে। প্রিয় নেতাকে নিয়ে আমরা মঞ্চে উঠলাম। তখন একটা রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল যে, আমি প্রত্যেকটি সভার সভাপতিত্ব করতাম এবং সভা পরিচালনা করতাম। কে বক্তৃতা করবে সেই নামটিও আমিই ঘোষণা করতাম। সেদিন ওই মঞ্চে ৪টি ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রেখেছিলেন। চিরাচরিত প্রথা ভঙ্গ করে আগেই সভাপতির ভাষণ দেয়ার জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ মানুষকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলাম, ‘সবার শেষে আমার বক্তৃতা করার কথা থাকলেও আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমি আগেই বক্তৃতা করতে চাই।’ দশ লাখ লোক আমাকে সম্মতি জানাল। বঙ্গবন্ধুর আগেই বক্তৃতা দিলাম। আমার জীবনে এই বক্তৃতাটির কথা চিরদিন মনে থাকবে। সেদিন কী ভালোবাসা যে আমি মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি তা বলে বোঝাতে পারব না। বক্তৃতায় আমি বঙ্গবন্ধুকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে বলেছিলাম, ‘প্রিয় নেতা তোমার কাছে আমরা ঋণী, বাঙালি জাতি চিরঋণী। এই ঋণ কোনদিনই শোধ করতে পারব না। সারা জীবন এই ঋণের বোঝা আমাদের বয়ে চলতে হবে। আজ এই ঋণের বোঝাটাকে একটু হালকা করতে চাই জাতির পক্ষ থেকে তোমাকে একটা উপাধি দিয়ে।’ আমি যখন ১০ লাখ লোককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘প্রিয় নেতাকে আজ আমরা একটা উপাধি দিতে চাই।’ তখন ১০ লাখ লোক হাত তুলে আমাকে সম্মতি জানিয়েছিল। আর তখনই আমি ঘোষণা করেছিলাম, ‘যে নেতা তার জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস-ানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন সেই নেতাকে জাতির পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করতে চাই।’ ১০ লাখ লোক তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে সেদিন এ প্রস-াব গ্রহণ করে প্রিয় নেতাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করে লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনি তুলেছিল, ‘জয় বঙ্গবন্ধু।’এমন একটি মধুর দিন আমার জীবনে আর কোনদিন আসবে না। বছর ঘুরে দিনটি যখন ফিরে আসে হূদয়ের মানসপটে কত স্মৃতি ভেসে ওঠে। এদিনের প্রতিটি মুহূর্তে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে মনে পড়ে। সেদিন বক্তৃতায় আমি আরও বলেছিলাম, ‘৬ দফা ও ১১ দফা কর্মসূচি বাস-বায়নে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রক্তের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমরা ফিরে পেয়েছি। তাদের সে রক্ত যেন বৃথা না যায়, তার জন্য জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাই।
কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ সব মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য এ আন্দোলন শুর" হয়েছে। প্রিয়নেতা, মানুষ তোমার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে। যদি এই বিশ্বাসের বরখেলাপ করো, তবে বাংলার মানুষ তোমাকে ক্ষমা করবে না।’ বক্তৃতা শেষ করে ঘোষণা করেছিলাম, ‘এখন বক্তৃতা করবেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।’ তুমুল করতালির মধ্যে তিনি বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন। চারদিকে তাকিয়ে উত্তাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে বললেন, ‘রাতের অন্ধকারে সান্ধ্য আইনের কঠিন বেড়াজাল ছিন্ন করে যে মানুষ ‘মুজিবকে ফিরিয়ে আনতে হবে’ বলে আওয়াজ তুলে গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তাদের দাবির সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না।’
সংগ্রামী ছাত্র সমাজকে আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ছাত্রদের ১১ দফা শুধু সমর্থনই করি না, এর জন্য আন্দোলন করে আমি পুনরায় কারাবরণে রাজি আছি। ছাত্রদের ১১ দফার মধ্যে আমার ৬ দফা দাবিও নিহিত রয়েছে। আপনারা নিশ্চিন- থাকুন। আমি যদি এদেশের মুক্তি আনতে ও জনগণের দাবি আদায় করতে না পারি, তবে আন্দোলন করে আবার কারাগারে যাব।’ উত্তাল গণআন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সংগ্রামী নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘আমি তাদের নেতা মেনে নিয়েছি। তারা যে নেতৃত্ব দিয়েছে তার তুলনা নেই।’ সর্বজনপ্রিয় দাবি ‘এক মাথা এক ভোট’-এর ভিত্তিতে নির্বাচন ও পার্লামেন্ট প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি সংখ্যা সাম্য মানি না।
কোনমতেই আমার দল সংখ্যা সাম্য মেনে নেবে না। জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন পার্লামেন্ট গঠন করতে হবে। বর্তমান শাসনতন্ত্র বাতিল করা হবে, না তা সংশোধন করা হবে, নির্বাচিত পার্লামেন্টই তা নির্ধারণ করবে। সংখ্যা সাম্য যারা মানবে বাংলার মাটিতে তাদের ঠাঁই নাই। সংখ্যা সাম্যের নামে এতকাল বাঙালিকে ঠকানো হয়েছে। সর্বস-রে এবং সর্বপর্যায়ে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব চাই।’ গোলটেবিলে জনগণের দাবি আদায় প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি রাওয়ালপিণ্ডি যাব এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস-ানের জনগণের পক্ষ হতে তাদের দাবি তুলে ধরব। দেশ আমরা কারও কাছে বিকিয়ে দেইনি। আমার ৬ দফার সঙ্গে জনগণ আছে।’ দেশরক্ষা খাতের ব্যয় বৈষম্য সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘এই খাতের শতকরা ৮০ ভাগ অর্থই পশ্চিম পাকিস-ানে ব্যয় হয়। কারণ সামরিক সদর দফতর সেখানে অবসি'ত।’ পাকিস-ানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে চাকরি বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রাজধানী পশ্চিম পাকিস-ানে অবসি'ত। ফলে সেখানকার লোক সব রকম সুবিধা পা"েছ।
দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ জন বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন চাকরিতে বাঙালিদের সংখ্যা শতকরা ১০ জনেরও কম। কেন্দ্রীয় সরকারের সব অফিস-আদালত শুধু রাজধানীতে। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যও সেখানে নিয়ন্ত্রিত হ"েছ। ফলে বাংলায় মূলধন গড়ে উঠছে না।’ রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের সরকারের ঘৃণ্য সিদ্ধানে-র বির"দ্ধে বলেন, ‘আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেকসপিয়র, অ্যারিস্টটল, দানে-, লেনিন, মাওসেতুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য আর দেউলিয়া সরকার রবীন্দ্রনাথের লেখা নিষিদ্ধ করেছে। রবীন্দ নাথ বাঙালি কবি। বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে তিনি বিশ্বকবি হয়েছেন।’ তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা সরকারের এই সিদ্ধান- মানি না। আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বোই, রবীন্দ্র সঙ্গীত এদেশে গীত হবেই হবে।’ ক্যান্টনমেন্টে দুঃসহ কারাজীবনের কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত স্বরে বলেন, ‘আমরা সবাই ফিরে এসেছি। কিন' সার্জেন্ট জহুর"ল হককে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারিনি। তার ভাইয়ের বাসায় যখন দেখা করতে গিয়েছি তারা বলেছে, ‘আমাদের কোন দুঃখ নেই। আপনি ফিরে এসেছেন আপনিই আমাদের বড় ভাই।’ পরিশেষে তিনি স্বভাবসুলভ কণ্ঠে কৃতজ্ঞস্বরে বলেন, ‘ভায়েরা আমার, তোমরা যারা রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছো, যদি কোনদিন পারি নিজের রক্ত দিয়ে আমি সেই রক্তের ঋণ শোধ করে যাবো।’ কী বিশাল হূদয়ের মানুষ ছিলেন তিনি। অবাক লাগে আজ ভাবতে, তিনি একা রক্ত দিয়ে যান নাই- ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে রক্ত দিয়ে বাঙালি জাতির রক্তের ঋণ তিনি শোধ করে গেছেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ২৩ ফেব্র"য়ারি একটি ঐতিহাসিক গুর"ত্বপূর্ণ দিন। যতদিন বেঁচে থাকব হূদয়ের গভীরে লালিত এ দিবসটিকে স্মরণ করব।
তোফায়েল আহমেদ
আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য; সভাপতি, শিল্প মন্ত্রণালয় সংক্রান- সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

সাবেক সামরিক জান্তা বীরউত্তম জিয়াউর রহমানের কথা

জিয়া ছিলেন যুগপৎ ধূর্ত কপট প্রতারক ষড়যন্ত্রকারী।….এমন অমানুষ সত্যি দুর্লভ "
---- প্রফেসর আহমদ শরীফ

সাবেক সামরিক জান্তা বীরউত্তম জিয়াউর রহমানের কথা ----
১৯৩৬ সালের এই দিনে বগুড়া জেলার বাগমারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান -

১। যিনি সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে বিদ্রোহ করে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন ।

২।যিনি মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর ও ফোর্স অধিনায়ক ছিলেন যার বিরুদ্ধে মুজিবনগর সরকার/ সিইনসি ওসমানী শাস্তিমূ্লক ব্যবস্থা নেয় ।

৩।যিনি ১৯৭৫ সালে ঘাত-সংঘাতময় সময়ের এক দু্র্বোধ্য চরিত্র ছিলেন !

৪। যিনি ৭ নভেম্বর '৭৫ এ জাসদের বীরউত্তম কর্নেল তাহেরের পরিকল্পনা ও উদ্যোগে পরিচালিত কথিত সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানে মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানি খালেদ-হায়দার-হুদার লাশের উপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন ২য় ফিল্ড রেজিমেন্টে ও ৪র্থ ইষ্ট বেঙ্গলের অফিসার ও সৈনিকদের প্রত্যক্ষ মদদে ।

৫। যিনি তাহেরের সাথে প্রথম দেখায় (৭ নভেম্বর '৭৫) তাকে আলিঙ্গন করে বলেন -"ইউ আর মাই ব্রাদার , ইউ আর মাই সেভার" । আর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হয়ে তাহের আর সিপাহিদের উপহার দেন ফাঁসি ।"Hang them by the neck till they are dead" -General Ziaur Rahman. বীরউত্তম তাহেরের ফাঁসি তদারকি করেন বীর উত্তম মীর শওকত ।

৫। বলা হয়, জিয়া তাহেরের সাথে বেঈমানি করেছেন । কথা সত্য কিন্তু জিয়া কার সাথে বেঈমানি করেননি ? বিধায়, জিয়ার পাওয়ারে আসার পাঁচ মাসের মধ্যেই কর্নেল রশিদ-কর্নেল ফারুক জিয়ার বিরুদ্ধে ক্যুর উদ্যোগ নেয় ।

৬। যার আমলে ১৯টি মতান্তরে ২০ টি ক্যু হয়েছে । পিয়ালের মতও আমিও মনে করি "আসলে ক্যুর জুজু তুলে মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের হত্যা এবং ফাঁসি দেওয়ার নীলনকশা ছিলো মাত্র।" তবে, শুধু "মুক্তিযোদ্ধা হত্যা" না বলে আমি বলব জিয়া তার নিরংকুশ ক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে বিরুদ্ধ বা সম্ভাব্য শত্রুদের নির্মমভাবে হত্যা করেছেন । "He was a man who could kill with one hand &eat with the other"-A Zia colleague during the liberation war in Chittagong. আর জিয়ার এই সব গণহত্যায় তার ডান হাত ছিলেন জেনারেল মন্জুর বীরউত্তম ,মীর শওকত বীরউত্তম আর লেজেহুমো এরশাদ ।

৭। যিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমন কথা জোরেশোরে বলা হয় যা একটি মিথ বৈ কিছু নয় ।

৮। যিনি সংবিধান থেকে 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র উপরে কাঁচি চালিয়ে অন্তর্ভুক্ত করেন 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' মুলনীতি হিসেবে স্থাপন করেন - 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর আস্থা আর বিশ্বাস'কে। সংবিধানের ১২ নং অনুচ্ছেদের উচ্ছেদ করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার সুযোগ পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করেন।

৯। রাজাকারদের শুধু রাজনীতি করার অধিকারই দেননি তাদের মন্ত্রীসভায়ও স্থান দেন । আন্তর্জাতিক রাজাকার শাহ আজিজকে বানান প্রধানমন্ত্রী । আরেক রাজাকার মওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ (শর্ষিণার পীর সাহেব)কে স্বাধীনতা পদক দিয়েছেন ।

১০। মুজিব হত্যায় তিনি জড়িত ছিলেন কিনা সেই প্রশ্নে না গিয়েও বলা যায় তিনি আগে থেকে জানতেন কিন্তু ঠেকাতে চাননি এবং পাওয়ারে এসেও তাদের বিচারের সম্মুখীন তো করেননি বরং বিচারের পথই রুদ্ধ করেন । হত্যার রাজনীতি যে ভাল নয় তা' স্বয়ং জিয়া নিজের জীবন দিয়ে প্রমান করেন । ৩০ শে মে ১৯৮১ , রোজ শনিবার , ভোর সাড়ে চারটা , চিটাগাং সার্কিট হাউজ । বর্ষন শ্রান্ত রজনীর শেষ প্রহর , চট্রগ্রামবাসীদের চকিত শংকিত করে জেগে উঠল নৈশ স্তব্ধতা ভঙ্গকারী গোলাগুলির শব্দ । সার্কিট হাউজ চত্বর ভরে গেল ধোয়া আর বারুদের গন্ধে । সার্কিট হাউজে ঘুমিয়েছিলেন তিনি ।গোলাগুলির শব্দে উঠে বসলেন ।

কি ব্যাপার ? ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে বেরিয়ে এলেন দরজা খুলে , পরনে রাতে শয্যার পোষাক । গভীর আত্মপ্রত্যয় আর অগাধ আস্থা নিয়ে বেরিয়ে এলেন ।

কি চাও তোমরা?

কাছে দন্ডায়মান লে. মোসলেহউদ্দিন রীতিমত ঘাবরে যান । সে জিয়াকে আশ্বস্ত করে-‘‘স্যার আপনি ঘাবরাবেন না । এখানে ভয়ের কিছু নেই ।’’ মোসলেহউদ্দিনের ঠোট থেকে জিয়ার প্রতি আশ্বাসবানী মিলিয়ে যাবার আগেই লে. কর্নেল মতিউর রহমান তার এসএমজি থেকে অতি কাছ থেকে ব্রাশ ফায়ার করেন জিয়ার শরীরের ডানদিক একেবারে ঝাঝরা করে ফেলে । দরজার কাছেই মুখ থুবরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন জিয়া ।

লেখার ইতি টানছি জিয়াকে নিয়ে প্রফেসর আহমদ শরীফ

"জিয়া ছিলেন যুগপৎ ধূর্ত কপট প্রতারক ষড়যন্ত্রকারী।….এমন অমানুষ সত্যি দুর্লভ "

****আওয়ামী লীগ-বিএনপি তফাতটা কতদূর*****

****আওয়ামী লীগ-বিএনপি তফাতটা কতদূর*****

******আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির তফাত চিহ্নিত করা না গেলে শুধু তিমির হননের গান গাইতে হবে। প্রভাতের আলোয় চেহারা চিহ্নিত করা যাবে না। আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে যে কি বিসত্মর ব্যবধান তাকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলতেই হবে। কখনও নানা কর্মকাণ্ডে দুই দলের পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আবার কখনও সে ফারাক এতই মলিন হয়ে পড়ে যে সে একমাত্র অণুবীৰণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয়।

******বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই দুই সংগঠনের সাংগঠনিক পরিচয়কে এক আকার করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেনানিবাস আর হাওয়া ভবনের বিএনপি আর রাজপথের আওয়ামী লীগের ভিন্ন পরিচয়কে স্পষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু দু'বছর যেতে না যেতেই আবার জনগণ কিছুটা বিভ্রানত্ম হয়ে পড়েছে দুই সংগঠনের পার্থক্যটা নিয়ে। আচার-আচরণে নেতৃত্বের পরিচয়ে যে পার্থক্য প্রবল হয়ে উঠেছিল, তা যেন আবারও মস্নান হতে শুরু করেছে।

*****ভারত বিভাগের পর পূর্ব বাংলার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল বাঙালীর ওপর পাকিস্তানী শাসকদের ধর্মের নামে যে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও কায়েমী স্বার্থের ধারকদের একনায়কসুলভ আচরণ, তার বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের জন্ম ছিল অবধারিত। পাকিস্তানীরা বাঙালীর ভাষা, কৃষ্টি, রাজনীতি ও অর্থনীতির বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিল এক দৃশ্যমান অবরোধ। তার বিরম্নদ্ধে ধারাবাহিক লড়াইয়ের ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগের সৃষ্টি। ব্যক্তি বিশেষের অবৈধ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা কিংবা কারও ক্ষমতা অর্জনের পথ তৈরি করে দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগের জন্ম হয়নি। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে।

*****আওয়ামী লীগের জন্মের আগেই কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে গেছে বাঙালী সমাজে। ১৯৪৮ সালেই মি. জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা উর্দু ঘোষণাকে রুখে দাঁড়িয়েছে বাংলার ছাত্রসমাজ। '৪৮ সালেই জন্ম নিয়েছে ছাত্রলীগ। তৎপর হতে শুরু করেছে উদীয়মান বাঙালী তরুণ সমাজ। এই সব সম্ভাবনা ও সংগ্রামকে রাজপথের লড়াইয়ে জীবনত্ম করার জন্য একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক গণসংগঠনের প্রয়োজন হয়ে উঠেছে অবধারিত। সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্যই গড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ।

*****আর বিএনপির জন্ম কোন স্বাভাবিক পথে হয়নি। জাতির জনকের হত্যাকান্ডের পর দখল করা অবৈধ ক্ষমতার ফল ভোগ করার জন্য জন্মেছে বিএনপি। উর্দি পরা সেনাপতি সেনা ছাউনিতে বসেই তৈরি করেছে দল। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যার পর দেশে সৃষ্টি হয়েছে নেতৃত্বের শূন্যতা।

****সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উর্দি পরে কামান দাগিয়ে নতুন নেতা হয়ে বসেছেন জিয়াউর রহমান। তিনি তার ক্ষমতার ছিটেফোঁটা ছড়িয়ে, রাজনীতিকদের চরিত্র হনন করে তার অস্ত্র ধরা রম্নৰ হাতে গড়ে তুলেছেন বিএনপি। গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে চরিত্রহীন রাজনীতির অসাধু সামরিক বেসামরিক আমলা, কালো টাকার মালিক, নব্য ধনী, পেশিশক্তির অধিকারী সমাজবিরোধী ও স্বাধীনতার শত্রম্নদের নিয়ে গড়ে উঠেছে ৰমতাসীন দল বিএনপি।

****ব্যক্তির সম্পদ রক্ষ্যা আর সেই সম্পদের উচ্ছিষ্ট ভোগ করার লক্ষেই এই দলের জন্ম। আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে বিএনপি গঠিত হয়নি।
***শাসন শোষণের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে। আর হত্যা ও অভু্যত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জন্মেছে বিএনপি।
****সেই সেনা শাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ দীর্ঘকাল সংগ্রাম করে দেশ স্বাধীন করেছে। সেই স্বাধীন দেশে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন সেনা শাসন।

****যেই স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ লড়াই করে লাখ লাখ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, সেই স্বাধীনতার শত্রুদের নিয়ে ৰমতায় থাকা-অবস্থায় গঠিত হয়েছে বিএনপি।

***জন্মসূত্রে কতটা বৈরী পরিবেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্ম তার জন্য কোন কঠিন অলৰ্য বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজন নেই।

***সোনার পাথর বাটিতে রূপার পায়েস খেয়ে বিএনপির জন্ম তা দিবালোকের মতই পরিষ্কার।

***দীর্ঘ পথ চলায় আওয়ামী লীগের নানা উত্তরণ ঘটেছে। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল। অসাম্প্রদায়িক আদর্শ চেতনা থেকেই মুসলিম শব্দ বাদ দিয়েছে পরবর্তীতে। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে নানা ধারা উপ-ধারার সমাবেশ ঘটেছিল আওয়ামী লীগে। '৫৬ সালের সম্মেলনে মওলানা ভাসানী কাগমারিতে আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন বামপন্থীদের নিয়ে। মওলানা ভাসানীর বিদায়ে আওয়ামী লীগের ধারা-উপ-ধারার উপদলীয় কোন্দলের অবসান ঘটে।

*****শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের উপরি কাঠামো নির্মিত হলেও এই সময়ে আওয়ামী লীগের পুরো সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে বঙ্গবন্ধুর সুদৃঢ় নেতৃত্বে। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃতু্র পর আওয়ামী লীগের পাকিস্তান রক্ষার বাড়তি দায়িত্ব আর নেতৃত্বের আপোসকামিতা ও দোদুল্যমানতার অবসান ঘটল। নয় নেতার সমন্বয়ে এনডিএফ গঠন করে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও পাকিসত্মানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন তার মৃতু্যর সাথে সমাপ্ত হলো।

*****এনডিএফের সাথে সাময়িক ইতি টেনেছিলেন সোহরাওয়ার্দী। বঙ্গবন্ধু পুনরম্নজ্জীবিত করলেন আওয়ামী লীগকে।

*****বাঙালীর স্বাধিকার, বাংলার স্বাধীনতা এই স্পষ্ট কর্মসূচী নিয়ে নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়াল বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ। মুসলিম ভূখ- স্বাধীন করার লৰ্যে যে বাঙালীরা মরণপণ লড়াই করেছে। সেই পাকিসত্মানে বাঙালীদের মুসলমান হিসেবে স্বীকার করল না পাকিসত্মানীরা।

******গুটিকয় স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক দালালদের দিয়ে পাকিসত্মানের সেনারা পাকিসত্মান রৰা করতে পারল না। কিন্তু কেড়ে নিল ত্রিশ লাখ প্রাণ, লুণ্ঠন করল কোটি মা-বোনের সম্ভ্রম। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তামা করে দিল বাংলাদেশ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঐক্যবদ্ধ বাঙালী স্বাধীন করল বাংলাদেশ।

*****বঙ্গবন্ধু তার দীর্ঘ একক প্রচেষ্টায় আর নিরলস সংগ্রামে আওয়ামী লীগকে পোউছে দিয়েছেন বাঙালীর ঘরে ঘরে। কৃষকের আঙিনা, শ্রমিকের বসত্মি, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর, অফিস-আদালতের দোরগোড়া সর্বত্র আওয়ামী লীগ একক সংগঠন হয়ে উঠেছিল। '৭১-এ রাজপথের সংগঠনকে বঙ্গবন্ধু পেঁৗছে দিয়েছেন সশস্ত্র যুদ্ধ ৰেত্রে। সেই আওয়ামী লীগকেই আবার যুদ্ধ শেষে দেশ গড়ার হাতিয়ারে পরিণত করতে চেয়েছেন বঙ্গবন্ধু।

***সুদীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই দলটি, তাই স্বাধীনতার পরই যে পদৰেপ বাঞ্ছনীয় ছিল, বঙ্গবন্ধু তা গ্রহণ করলেন '৭৪-৭৫-এ। অর্থনৈতিক মুক্তির লৰ্যে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপস্নবের ডাক দিলেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভেতরে বাইরে শত্রম্নরা অনেকটা সংগঠিত হয়ে উঠেছে। তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সব সর্বনাশা পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেনি।

******বঙ্গবন্ধুর মৃতুর পর শুরু হলো ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। একের পর এক চক্রান্তেরর শেষে জিয়াউর রহমান অধিকারী হলেন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার।

মোশতাকের বিদায়,

সায়েমের অপসারণ,

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিচারের নামে প্রহসনে ঘটল শত শত হত্যাকান্ড ,

সামরিক ফরমানের দ্বারা গণতান্ত্রিক সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন, যুদ্ধ অপরাধী স্বাধীনতার শত্রম্নদের মুক্তি ও ক্ষমতায় অধিষ্ঠান, রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শ হিসেবে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িকতাকে গ্রহণ,

নব্য লুটেরা ধনিক শ্রেণীর সৃষ্টি এবং সরকারী ৰমতা খাটিয়ে ৰমতাসীন রাজনৈতিক দল তৈরি করা
সব মিলিয়ে একক ক্ষমতার অধিকারী হলেন জিয়াউর রহমান।

*******কিন্তু এত আয়োজন ভেস্তে গেল। অসময়ে উচ্চাভিলাষী ক্ষমতা দখলের ঝড়ো হাওয়ায় জিয়ার সাজানো বাগান ল-ভ- হয়ে গেল নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছরের মাথায় কৃত্রিম সূতিকাগারে অসময়ে অকারণে জন্ম নেয়া বিএনপি এবার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারল না। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগী মেরম্নদ-হীন বিএনপি এরশাদের হুঙ্কার শুনে নুয়ে পড়ল। একই আদলে, একই আদর্শে, একই কায়দায় এরশাদও গড়ে তুললেন ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টি।

******বিএনপি দ্বিতীয় পর্বে এরশাদবিরোধী সংগ্রামে নামলেও এরশাদের ৰমতার উচ্ছিষ্ট প্রকাশ্যে ভোগ করতে দ্বিধান্বিত হলো না। সেনানিবাসের বাড়ি, গুলশানে দ্বিতীয় বাড়ি, সরকারী মাসোহারা, পড়াশোনা বিচ্ছিন্ন পুত্রদের পড়ার নামে রাখা খরচ নিতে ভুলল না জিয়া পরিবার। আন্দোলনে রাজপথ রঙিন করতে দলীয় প্রধান রূপে অভিষিক্ত করা হলো বেগম খালেদা জিয়াকে।

*****এই পর্বেও বিএনপির আন্দোলন কোন পণ দাবি পূরণের জন্য ছিল না। এরশাদকে হটিয়ে হারানো ৰমতা পুনরম্নদ্ধার করাই ছিল একমাত্র লৰ্য। জিয়াউর রহমান বিসমিলস্নাহ বলে স্বাধীনতার শত্রম্নদের পুনর্বাসনের পথ খুলে দিলেন আর এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের নামে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নতুন শক্তি যোগালেন। খালেদা জিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে ছিলেন বিএনপির অপরাজনীতির। তিনি জোট গঠন করলেন স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে।

*****এবার ৰমতার উচ্ছিষ্ট নয় তিনি সরাসরি ৰমতার অংশীদার করে নিলেন তাদের। সাম্প্রদায়িকতার সাথে জঙ্গীবাদ আর দুনর্ীতির মহাউৎসব ঘটালেন ৰমতায় বসে। তিনি বিএনপি নেতৃত্বের বৃহদাংশ তুলে দিলেন তার সুর্য সনত্মানদের হাতে। বিএনপির কাছে যুবরাজ ঘোষিত হলো তার এক ছেলে। সময়ের পরিবর্তনে যুগের দাবিতে এক চুল বদলালো না বিএনপি। স্বাধীনতার আদর্শ পরিপন্থী ধমর্ীয় সাম্প্রদায়িকতাকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে আরও আকড়ে ধরল বিএনপি। গণমানুষের প্রত্যাশাকে উপেৰা করে পাওয়া ৰমতা কেবল স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতির জন্ম দিতে পারে। জনকল্যাণ করতে পারে না।

******আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছিল যতটা স্পষ্ট ততটা পরিচ্ছন্ন। অর্ধ শতাব্দীর অধিক সময় আওয়ামী লীগ একই আদর্শের চর্চা করেছে। অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র, বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও শোষণহীন অর্থনীতির আপোসহীন ধারক আওয়ামী লীগ। কিন্তু জিয়াউর রহমান পার্টির লুটেরা অর্থনীতি ও রাজনীতির নব্য সংস্কৃতি আওয়ামী লীগকে কিছুটা বিভ্রানত্ম করে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি যেমন স্পষ্ট, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচীও হওয়া উচিত পরিচ্ছন্ন।

*****বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শোষণহীন বাংলাদেশ গড়তে তাঁর দ্বিতীয় বিপস্নবের কর্মসূচীর আলোকে পরিবর্তিত সময়ের প্রেৰাপটে আওয়ামী লীগের যুগোপযোগী কর্মসূচী প্রণয়ন জরম্নরী। কিন্তু সে পথে এখনও এগোয়নি আওয়ামী লীগ।

***জিয়ার নব্য রাজনৈতিক কালচার দেশে একটা বিকৃত গুণগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে।দলীয় নেতৃত্বে অরাজনৈতিক পয়সাওয়ালাদের প্রতিষ্ঠা দান। সংসদে রাজনৈতিক কর্মীদের বাদ দিয়ে নব্য ধনীদের অগ্রাধিকার শুধু দৃষ্টিকটুই হয়নি।

****বিএনপির জন্য মেধা ও উত্তরণের প্রশ্ন অবানত্মর। আর আওয়ামী লীগের জন্য মেধা ও উত্তরণের বিকল্প নেই। দলীয় নেতৃত্ব আর সংসদ সদস্যদের দেখে যদি জনগণ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে চিহ্নিত করতে না পারে তবে সে দুঃখ আওয়ামী লীগের একার।

****আওয়ামী লীগ দিনবদলের ডাক দিয়েছে কিন্তু দিনবদল করতে হলে বিএনপি মার্কা আওয়ামী লীগারদের দিয়ে হবে না। বিএনপি ক্ষমতার জন্য লড়াই করবে, ক্ষমতা পেলে দুর্নীতির আশ্রয় নেবে। মওদুদ, সাকা, বাবররা বিএনপির জন্য বোঝা নয়, তারা বিএনপির অলঙ্কার। আর আওয়ামী লীগে এ রকম একটা জিনিসই দশটা বিষফোঁড়া হয়ে উঠবে।