Thursday, November 26, 2009

HAPPY EID MUBARAAK

Blessings Be With You On Eid...
Reach out to your near and dear ones on Eid ul-Adha with this beautiful wish

Tuesday, November 24, 2009

ওঁরা বহাল তবিয়তে

ওঁরা বহাল তবিয়তে
০ বঙ্গবন্ধুর খুনীদের আইনজীবীরা বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন
০ একইভাবে বর্তমান সরকারের আইন উপদেষ্টা বিএনপি জামায়াতের নেতা ও তারেক রহমানের আইনজীবী
০ বহাল তবিয়তে আছেন বিএনপি আমলের ৬ ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল ও ১৮ সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল
বিকাশ দত্ত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার মৃতু্যদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আইনজীবী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত আইন উপদেষ্টা এখনও সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ঠিক তেমনিভাবে বহাল তবিয়তে আছেন বেশ কয়েক ডেপুটি ও সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল। এর ফলে সরকারের গোপন তথ্য পাচার হয়ে যাচ্ছে। আইনগত দিক দিয়ে সরকার দুর্বল হয়ে পড়ছে।আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দীর্ঘ ১১ মাসেও এ সমস্ত বিতর্কিত আইন উপদেষ্টা (লিগ্যাল এ্যাডভাইজার), সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরে কাজ করে যাচ্ছেন। ঠিক একইভাবে কাজ করছেন বিএনপি-জামায়াত আমলে নিয়োগ পাওয়া ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেলগণ। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আদর্শ বিশ্বাস করে না অথচ তাঁরা সরকারের পক্ষ হয়ে কাজ করছেন।তাঁদের কাজের ফলে বিশেষ করে ব্যাংক, তিতাস গ্যাস, পেট্রোবাংলা, রাজউক, পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে এখনও বিএনপি-জামায়াত ধ্যানধারণা কৌশলে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। কৌশলগত দিক থেকে সরকারকে ভালর চেয়ে বিপাকে পড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াতের আইন উপদেষ্টা থাকাতে বিএনপি-জামায়াত লাভবান হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তারা সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর খুনী লে. কর্নেল (অব) একেএম মহিউদ্দিন (ল্যান্সার) ও মেজর (অব) বজলুল হুদার আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন তিতাস, ডেসা, পেট্রো বাঙলা সহ ৫টি সরকারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের লিগ্যাল এ্যাডভাইজার। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমানের আইনজীবী খান সাইফুর রহমান হাউজিং সেটেলমেন্টের আইনজীবী। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রেজ্জাক বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ও পিডিপির লিগ্যাল এডভাইজার। জামায়াতের অপর নেতা এ্যাডভোকেট মোঃ সালেহ উদ্দিন হাউজিং সেটেলমেন্ট বিভাগের আইনজীবী। জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার মুন্সী আহসান কবীর পল্লী বিদু্যত উন্নয়ন বোর্ড, তানজিমুল আলম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিগ্যাল এ্যাডভাইজার। বিএনপি নেত্রী ফেরদৌস আক্তার ওয়াহিদা ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইনজীবী। উল্লেখ্য, এ্যাডভোকেট ফেরদৌস আক্তার বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন। তীব্র আওয়ামী লীগবিরোধী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম রাজউক, বিএনপির সাবেক এমপি খালেদা পান্না ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আইনজীবী। সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে বিএনপি প্যানেলের সম্পাদক প্রাথর্ী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল সোনালী ব্যাংক, বেপজার লিগ্যাল এ্যাডভাইজার। বিএনপির আব্দুল কাদের তালুকদার, রাজউক, সাবেক স্পীকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জুনিয়র ইদ্রিস খান সেকেন্ডারি এডুকেশন লিগ্যাল এ্যাডভাইজার। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ক্রিকেট বোর্ড, বিএনপির ব্যারিস্টার আকবর আমিন বাবুল সোনালী ব্যাংক, বিএনপির মাহমুদা বেগম সোনালী ব্যাংক, খোন্দকার মাহবুব উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এবং ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন তিতাস গ্যাসের লিগ্যাল এ্যাডভাইজার পদে রয়েছেন। তিনি খুনী মোস্তাকের সহযোগী ছিলেন। বিএনপি সরকার আমলে ডেপুটি এ্যাটর্নিগণ এখনও বহাল আছেন। এঁরা হচ্ছেন রাজিক আল জলিল, নাহিদ মাহতাব, নাহিদ ইয়াসমিন, জহিরুল হক জহির, এএসএম আব্দুল মবিন ও করুণাময় চাকমা। করুণাময় চাকমাকে বিএনপি আমলে নিয়োগ দেয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে বাদ দিলেও বর্তমান সরকারের সময় তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিএনপির সাবেক এমপি আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার লোক। অপরদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল পদে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এখনও কাজ করে যাচ্ছেন। এঁরা হলেন একেএম সালাউদ্দিন খান, নওয়াজীশ আরা বেগম এ এফএম জোবায়ের হোসেন, মাহফুজা বেগম, মিসেস রোনানাহারীন, মোঃ সোয়েব খান, মামুনুর রশীদ, সালমা রহমান, ফরিদা ইয়াসমিন, আব্দুল খালেক, একরামুল হক (টুটুল), এবিএম মাহবুব জিনাত হক, খন্দকার দিলুরুজ্জামান, সুচিরা হোসেন, ইসরাত জাহান, আলহাজ্ব মোঃ শহীদুল ইসলাম খান ও মোঃ মনিরুজ্জামান। অর্থাৎ বিএনপি আমলের ৬ জন ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৮ জন সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল এখনও বহাল রয়েছেন।বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবীরা। এসব আইনজীবী মনে করেন ৪ দলীয় জোট সরকারের বিদায়ের পর সরকারী দফতরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা নিয়োগ পাবেন। অথচ দীর্ঘ ১১ মাস পার হয়ে গেলেও এখনও তাঁরা দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন। বিএনপি-জামায়াত এবং বঙ্গবন্ধুর খুনীদের আইনজীবীরা কখনও এ সরকারের স্বার্থ রক্ষা করবে না। উপরন্তু সরকারের গোপন তথ্যাদি পাচার করবে। এর ফলে আগামীতে সরকারকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে। বেশ কিছু আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠ প্রতিনিধিকে বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব বিতর্কিত লিগ্যাল এ্যাডভাইজার ও প্যানেল লইয়ারদের বাদ দিয়ে নতুন করে শূন্যস্থানে নিয়োগ দিতে হবে। তা না হলে সরকারের মারাত্মক ভুল হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকার পদে পদে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সুপ্রীমকোর্টের বিশিষ্ট আইনজ্ঞগণ। দীর্ঘ ৩৪ বছর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় হয়েছে। আপীল বিভাগ কারাগারে আটক পাঁচ আসামির আপীল নাকচ করে দিয়েছে। হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছে। সেদিক থেকে হাইকোর্টের দেয়া ১২ জনের মৃতু্যদণ্ড এখন বহাল রয়েছে। রায়ের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। অথচ খুনীদের আইনজীবীরা। বর্তমান সরকারের সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লিগ্যাল এ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। এর ক্ষতিকর দিক উপলব্ধির জন্য সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবীরা।

৭৫ থেকে ৯৬ বঙ্গবন্ধুর খুনিরা যেভাবে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পান! বঙ্গবন্ধুর খুনিদের লিবিয়া নিয়ে যায় বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শমসের মবিন চৌধুরী

৭৫ থেকে ৯৬ বঙ্গবন্ধুর খুনিরা যেভাবে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পান !
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের লিবিয়া নিয়ে যায় বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শমসের মবিন চৌধুরী জসীম উদ্দিন
রাষ্ট্রদূত থাকাবস্থায় ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি অনুষ্ঠানে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত শমসের মোবিন চৌধুরী ও মিসেস চৌধুরীকে দেখা যাচ্ছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ৩৪ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ছাড়া সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে চাকরি দিয়ে খুনিদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার বিরল সমমান দিয়েছেন জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকার। এই তিন সরকারের আমলে দূতাবাসগুলোতে চাকরির পাশাপাশি পদোন্নতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, দল গঠন ও সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগও পেয়েছে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের প্রায় সবাই। এভাবে হত্যাকারীরা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পাওয়ায় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারও বিলম্বিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত এবং পরবর্তীতে রাষ্টদূত ও পররাষ্ট্র সচিব হওয়া বেশ কয়েকজন কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর জেল হত্যার পর কিভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র খুনিদের দেশত্যাগের সুযোগ দেয় এবং চাকরি দিয়ে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। খুনিদের বাংলাদেশের প্রতিনিধি বানিয়ে দূতাবাসগুলোতে চাকরি দেয়াকে এক লজ্জাজনক অধ্যায় বলে অভিহিত করেছেন সাবেক কূটনীতিকরা। তারা জানান, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দূতাবাসে চাকরি দেয়ার বিষয়টি পোল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ মেনেও নেয়নি। কোন কোন কর্মকর্তা নানাভাবে এ ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন। সাবেক কূটনীতিকরা জানান, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলহত্যার পর ৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের একটি বিশেষ বিমানে রেঙ্গুন হয়ে ব্যাংকক পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখান থেকে পাকিসতান সরকারের দেয়া একটি বিমানে তাদের লিবিয়া নিয়ে যাওয়া হয়। লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়ামমার গাদ্দাফি তাদের সাদরে গ্রহণ করেন। তারা বলেন, বাংলাদেশ থেকে তাদের সঙ্গে যান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন পরিচালক, জোট আমলের পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শমসের মবিন চৌধুরী। সব খুনিকে একসঙ্গে লিবিয়ায় রাখা নিরাপদ নয় মনে করে ১৯৭৬ সালের ৮ জুন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের ১২ জনকে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা করেন। কয়েকজন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব বলেন, খুনিরা লিবিয়াতে বসে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধেও নানা ষড়যন্ত্র করতে পারে এই আশংকা থেকেই তাদের চাকরি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া হয়। তবে হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বদানকারী লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান ও লে. কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশীদ চাকরিতে যোগ দিতে রাজি হননি। তারা জিয়া সরকার ও লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফির সঙ্গে সমঝোতা করে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেন। জিয়া সরকার যাদেরকে চাকরি দেয় তাদের মধ্যে লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিমকে চীন দূতাবাসে প্রথম সচিব, লে. কর্নেল আজিজ পাশাকে আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব, মেজর একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকে আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব, মেজর বজলুল হুদাকে পাকিসতানে দ্বিতীয় সচিব, লে. কর্নেল শাহরিয়ার রশিদকে ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব, মেজর রাশেদ চৌধুরীকে সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব, মেজর নূর চৌধুরীকে ইরানে দ্বিতীয় সচিব, মেজর শরিফুল হোসেনকে কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব, কর্নেল কিসমত হাশেমকে আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব, লে. খায়রুজ্জামানকে মিসরে তৃতীয় সচিব, লে. নাজমুল হোসেনকে কানাডায় তৃতীয় সচিব ও ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদকে সেনেগালে তৃতীয় সচিব হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। ঢাকা থেকে শমসের মবিন চৌধুরী তাদের জন্য পাসপোর্ট তৈরী করে নিয়োগপত্র, ব্যাগ, জিনিসপত্র, নগদ অর্থসহ লিবিয়া যান। আর লিবিয়ায় খুনিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব কিছু প্রসতুত করেন সেনা কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম শিশু। পরবর্তীতে এরশাদ সরকার ডালিমকে বেইজিংয়ে নিয়োগ দিতে গিয়ে না পেরে পরে হংকংয়ে ভারপ্রাপ্ত মিশন প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেন। পোল্যান্ডে ডালিমকে একই পদে নিয়োগ দিলেও সেদেশের সরকার তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর লন্ডনে এরশাদ ও ডালিমের মধ্যে এক বৈঠকের ভিত্তিতে তাকে কেনিয়াতে হাইকমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়। অন্যদের মধ্যে পরবর্তীতে আজিজ পাশা ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রোমেও দায়িত্ব পালন করেন। একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ সৌদি আরবের মিশন উপ-প্রধান হিসাবে নিয়োগ পান। রাষ্ট্রদূত সিএম শফি সামীর দাবি অনুযায়ী তার বিরোধিতার কারণে এবং বেনজির ভুট্টো গ্রহণ করতে রাজি না হওয়ায় একই পদে মহিউদ্দিনকে করাচিতে নিয়োগ দিতে পারেনি এরশাদ। রাশেদ চৌধুরী টোকিও’র কাউন্সিলর হন। নূর চৌধুরীকে এরশাদ আমলে আলজেরিয়ায় কাউন্সিলর হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে তিনি ব্রাজিলে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। শরিফুল হোসেন ওমানে চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স নিযুক্ত হন। অন্যরাও পদোন্নতি পান। তাদের জন্য পদোন্নতি, সুযোগ-সুবিধা সব অবারিত ছিল। শুধু তাই নয়, এসব খুনি এরশাদ ও খালেদা জিয়া সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রাজনীতিতে অংশ নেন এবং রাজনৈতিক দল গঠন করেন। শাহরিয়ার রশিদ ও বজলুল হুদা ১৯৮০ সালের পর প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি নামের একটি দল গঠন করেন। ১৯৮৭ সালে ফারুক রহমান ও আব্দুর রশিদ গঠন করেন ফ্রিডম পার্টি। পরে বজলুল হুদাও ফ্রিডম পার্টিতে যোগ দে। এর আগে ১৯৮৬ সালে এরশাদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করেন লে. কর্নেল ফারুক। বজলুল হুদা ফ্রিডম পার্টির হয়ে ১৯৮৮’র নির্বাচনে মেহেরপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রম্নয়ারি খালেদা জিয়ার ভোটার বিহীন এক তরফা নির্বাচনে কুমিল্লা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন লে. কর্নেল রশিদ। এভাবে এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলে খুনিরা সংসদে বসেন। সাবেক কূটনীতিকরা আরো জানান, খুনিরা বিভিন্ন দেশে চাকরিকালীন নানা ধরনের অনিয়ম, বিশৃংখলা ও চাকরি বিধি লংঘন করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেন। এদের মধ্যে ডালিম নানা জায়গায় অনেক অঘটনের জন্ম দেন। তাকে পোল্যান্ড সরকার গ্রহণ না করায় সে নিয়োগের আদেশ না থাকা সত্ত্বেও লন্ডন চলে আসে। এরশাদ লন্ডন সফরের সময় হিথ্রো বিমান বন্দরের এলকক এন্ড ব্রাউন স্যুটে এবং পরবর্তীতে হোটেলে তার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। অথচ সে সময় তার কোন নিয়োগপত্র ছিল না। কেনিয়া সরকার ডালিমের অকূটনীতিসুলভ আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ সরকারের কাছে অভিযোগ করে। ডালিম চীনে কর্মরত অবস্থায় সেখানকার রাষ্ট্রদূত আব্দুল মমিনকেও নানাভাবে হেনসতা করেন। বজলুল হুদা পাকিসতানে দূতাবাসের কর্মচারিদের মারধর করতেন। আজিজ পাশা তুরস্কের কাউন্সিলর থাকাকালীন তৎকালীন রাষ্ট্রদূতকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে একটি কক্ষে আটকে রাখেন। ওই রাষ্ট্রদূত তখন ঢাকায় এসওএস বা জরুরি উদ্ধার বার্তা পাঠিয়ে উদ্ধার পান। বজলুল হুদা ’৯৭ সালে ব্যাংককে একটি সুপারস্টোরে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েন। প্রসঙ্গত বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট খুনিদের আপিলের রায়ে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত লে. কর্নেল (বরখাসত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে.কর্নেল (অবঃ) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, লে. কর্নেল (অবঃ) মহিউদ্দিন আহমেমদ (আর্টিলারি), মেজর (অবঃ) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেমদ (ল্যান্সার) ও মেজর (অব.) বজলুল হুদা বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর ৬ জন পলাতক রয়েছেন। এরা হচ্ছেন লে. কর্নেল (অব.) এসএইচ এমবি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) শরীফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে. কর্নেল (অব.) এম এ রাশেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। এছাড়া লে. কর্নেল (অবঃ) মোঃ আজিজ পাশা পলাতক থাকা অবস্থায় ২০০২ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা যান। তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সিএম শফি সামী বলেন, খুনিদের এভাবে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য দেয়া, দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে দেয়া ছিল জাতির জন্য এক লজ্জাজনক অধ্যায়। এ ঘটনাগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। আনোয়ার সাদাত বেঁচে থাকাকালীন একজন রাষ্ট্রদূত পরিচয়পত্র পেশ করতে গেলে তাকে প্রকাশ্যেই তিনি বলেছিলেন, আমার ট্যাংক দিয়েই তোমরা আমার বন্ধুকে হত্যা করেছো। শফি সামী বলেন, ১৯৮৭ থেকে ’৯১ সাল সময়কালে একেএম মহিউদ্দিনকে পাকিসতানের করাচিতে ডেপুটি হাইকমিশনার নিয়োগ দেয়া হলে আমি তাকে মেনে নেইনি। পাকিসতান সরকারকে জানিয়েই তিনি একেএম মহিউদ্দিনকে প্রত্যাখ্যান করেন বলে জানান। এছাড়া ’৯২-’৯৩ সালে চীনের রাষ্ট্রদূত থাকাকালেও রাশেদ চৌধুরীকে উপ-হাইকমিশনার হিসাবে নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সেভাবে সংগঠিত প্রতিবাদ না হলেও অনেকে বিভিন্ন উপায়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। ’৭৫ সালে লন্ডনে ডেপুটি হাইকমিশনার এবং সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক চৌধুরী বলেন, হত্যাকারীদের বিভিন্ন দূতাবাসে নিয়োগ অনেকে মেনে নিতে না পারলেও তাদের কিছু করার ছিল না। কেননা সামরিক শাসকরাই তাদের নিয়োগ দেয়, সব নিয়ম-কানুন তাদের হাতে। আবুধাবীতে কর্মরত থাকার সময় আমার অধীনে অভিযুক্ত কিসমত হাসেমকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, এটা ছিল একটি অসহনীয় ঘটনা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা হিসাবে রাষ্ট্রের নিয়োগের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যায় না। তিনি বলেন, নিয়োগের আদেশগুলো আসতো চীফ মার্শাল এডমিনিস্ট্রেটরের অফিস থেকে। তাই আদেশগুলো আমি কখনোই খুঁজে পাইনি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় ফ্রান্সে কর্মরত সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেক মেধাবি কর্মকর্তার ওপরে খুনিদের সরাসরি কাউন্সিলর, প্রথম সচিবের মত উচ্চপদে নিয়োগ দেন জিয়াউর রহমান। এরশাদ সরকারও তাদেরকে পুরস্কৃত করে। তিনি একেএম মহিউদ্দিন, শরফুল হোসেন, আজিজ পাশাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং অন্যদের উচ্চতর পদে পদোন্নতি দেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় সুইজারল্যান্ডের জেনেভা মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান এবং পরবর্তীতে সচিব পদমর্যাদায় ফরেন সার্ভিস একাডেমীর প্রিন্সিপ্যাল মহিউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে বলেন, জিয়া সরকার প্রাথমিকভাবে খুনিদের লিবিয়াতে নিয়ে গেলেও ষড়যন্ত্রের আশংকায় তাদের সবাইকে সেখানে একসঙ্গে রাখার সাহস পায়নি। তখন তাদেরকে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়। তিনি বলেন, শমসের মবিন চৌধুরী, মেজর জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশু ঢাকা থেকে সবকিছু তদারক করেন। নূরুল ইসলাম শিশু এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমাতে বাস করেন। এই দুইজন সেনাবাহিনীতে জিয়ার ঘনিষ্ঠ ছিলেন, সহকর্মী হিসাবে খুনিদেরও চিনতেন। তিনি জানান, শমসের মবিনকে আহত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে বঙ্গবন্ধুই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি দেন। ’৭৫-এ শমসের মবিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ছিলেন। সাবেক রাষ্ট্রদূত মোসতফা ফারুক মোহামমদ এমপি ’৭৫-এ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, এক অস্বসিতকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সময় পার করেছেন। অনেকে অফিসে আসতেন না। তেমন কোন কাজকর্ম করতেন না কেউ। অল্প কয়েকজন কর্মকর্তা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই খুনিদের বিদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, অনেক দেশ তাদের নিয়োগ মেনে নিলেও ভিয়েতনাম, পোল্যান্ড কাউকে মেনে নিয়নি। এমনকি পরবর্তীতে পাকিসতানও খুনিদের একজনকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

পনরই আগস্টের ঘটনা কি একটি সামরিক অভ্যুত্থান ছিলো ?
নভেম্বর ২৪, ২০০৯ উনিশে নভেম্বর তারিখে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। বারোজন আসামীর (একজন মৃত) জন্য হাইকোর্ট বেঞ্চের আগের দেওয়া প্রাণ দণ্ডাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে। দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর পরে হলেও জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হলো এবং অপরাধীরা শাস্তি পেতে যাচ্ছে। এটা বাংলাদেশের দলমত নির্বিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছেই স্বস্তি ও সন্তোষের বিষয়। দেশের মিডিয়ার আলোচনা এবং বেতার ও টিভির টকশোগুলোতেও এই স্বস্তি ও সন্তোষের ভাব লক্ষ্য করা গেছে।উনিশ নভেম্বর দুপুরে (লন্ডন সময়) বিবিসি বেতারের বাংলা বিভাগও হত্যা মামলার এই রায় সম্পর্কে একটি আলোচনা প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাতে আমিও অংশ গ্রহণ করেছিলাম। এই আলোচনায় ঢাকা থেকে যোগ দিয়েছিলেন বিএনপি ঘরানার এক প্রবীণ বুদ্ধিজীবীও। তিনি খুব কৌশলে এই হত্যাকাণ্ডের চরিত্র এবং তার বিচার সম্পর্কেও বিতর্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন।আমার কাছে বিস্ময়কর লেগেছে, একটি মুক্তি সংগ্রামের নায়ক এবং একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রধানকে সপরিবারে নৃশংস হত্যার বিচার বন্ধ রাখার জন্য প্রথমে ঘাতকদের জন্য ইমডেনটিটি অধ্যাদেশ জারি, তার পর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি এই বিচার শুরু হলে তা বন্ধ রাখার চেষ্টা আরো পরে বিচারকদের আপিল শুনানিতে বিব্রত বোধ করা ইত্যাদি এতো কিছুর পরেও দেশের সাধারণ আইনে, সাধারণ বিচার ব্যবস্থায় বিষয়টি যখন হলো এবং একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অপরাধীরা যখন দেশের সকল মহলের কাম্য শাস্তি পেতে যাচ্ছে, তখনো এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে, হত্যাকারীদের সম্পর্কে কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী বিভ্রান্তি সৃষ্টির ‘নৈতিক বল’ খুঁজে পান কেমন করে ?বিবিসি’র উনিশে নভেম্বরের আলোচনায় ঢাকা থেকে যে প্রবীণ বুদ্ধিজীবী অংশ গ্রহণ করেছিলেন তার (এবং তার সমমনা ব্যক্তিদের) মতে, “১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডটি কোনো চক্রান্তপ্রসূত হত্যাকাণ্ড নয়। এছিলো সাময়িক অভ্যুত্থান।” তার বক্তব্যের নির্গলিতার্থ হলো, সকল সামরিক অভ্যুত্থানের কোনো বিচার হয়না এবং এই অভ্যুত্থানে যে হত্যাকাণ্ড ঘটে তার জন্য ব্যক্তি বিশেষ বা ব্যক্তিগতভাবে কোনো গোষ্ঠি দায়ী নয়। ইতিপূর্বে বিএনপি ঘরানার আরো কেউ কেউ বলেছেন, ১৫ আগস্টের হত্যার বিচার সামরিক আইনে হওয়া উচিত ছিলো। অর্থাৎ বর্তমান বিচার পদ্ধতির বৈধতা সম্পর্কে তারা প্রশ্ন তুলতে চান।বিবিসি’র উনিশে নভেম্বরের আলোচনায় ঢাকার বুদ্ধিজীবী একটি পরস্পর বিরোধী কথা বলেছেন। তিনি একদিকে বলেছেন ১৫ আগস্টের ঘটনা একটি সামরিক অভ্যুত্থান, অন্যদিকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন – আওয়ামীলীগ নেতৃত্বের একাংশই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। এই একাংশের নেতা খোন্দকার মোশতাকই এই হত্যা চক্রান্তের মূল নায়ক এবং হত্যাকাণ্ডের পর তার নেতৃত্বে মুজিব সরকারের সাবেক সদস্যদের নিয়েই নতুন সরকার গঠিত হয়েছিল। আমার প্রশ্ন – সামরিক অভ্যুত্থানে কি অসামরিক নেতৃত্ব থাকে এবং অসামরিক সরকার গঠিত হয়?পনেরই আগস্টের ঘটনার পর পর গত চৌত্রিশ বছর ধরে ঘটনাটি সম্পর্কে নানা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। বিবিসি’র উনিশে নভেম্বরের আলোচনায় ঢাকা থেকে বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী যা বলেছেন, তারও জবাব একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বহুবার দিয়েছেন। তারপরেও সেই হত্যা মামলার আপিল শুনানির রায়কেও কেন্দ্র করে নতুন করে পুরনো কাসুন্দি ঘাটার চেষ্টা, বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।প্রথম কথা, বাংলাদেশে পনেরই আগস্টের ঘটনা যদি সামরিক অভ্যুত্থানই হবে তাহলে এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রধান সেনাপতি, বিমান, নৌ ও স্থল বাহিনীর প্রধানদের সংশ্লিষ্টতা কোথায় ? পনেরই আগস্টের হত্যা মামলার আপিল শুনানিতে আদালত বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের পর প্রধান সেনাপতি ভীরুতার পরিচয় দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি হত্যা চত্রান্তে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু এই হত্যাকারীদের প্রতিরোধ এবং দেশের প্রেসিডেন্টের জীবন রক্ষার কাজে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন এবং ভীরুতার পরিচয় দিয়েছেন। আদালতের এই মন্তব্য তাহলে সেনাবাহিনীর স্থল, নৌ, বিমান বাহিনীর তখনকার প্রধানসহ খালেদ মোশাররফ, সফায়াত জামিল প্রমুখ সেনাবাহিনীর তদানিন্তন আরও অনেক কর্মকর্তা সম্পর্কে সত্য। তারা তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানকে সপরিবারে হত্যার চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবে এই চক্রান্ত রোধে ব্যর্থতা অথবা ভীরুতার পরিচয় দিয়েছেন। তারা এই হত্যাকাণ্ডের বেনিফিসিয়ারিও হননি।এখানেই প্রশ্ন, সামরিক অভ্যুত্থান দ্বারা প্রধান সেনাপতিসহ তিন বাহিনীর প্রধানই ক্ষমতায় বসতে পারলেন না এটা কেমন কথা ? এটা কি ধরণের সেনা অভ্যুত্থান ? এই অভ্যুত্থানের প্রধান সেনাপতি ও বিমান বাহিনী প্রধানকেও রাষ্ট্রদূত করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই অভ্যুত্থানের একমাত্র বেনিফিসিয়ারি হন ডেপুটি সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান। তাকে সামরিক বাহিনীর চাকুরি থেকে অপসারণ করে রাষ্ট্রদূতের চাকুরি দিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়নি। তাকে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল। তিনি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা না করে তাদের বিচারের পথ রুদ্ধ করার জন্য সংবিধানে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ যুক্ত করেন এবং ঘাতকদের অধিকাংশকেই সরকারি উচ্চপদে নিয়োগ দ্বারা পুরস্কৃত করেন।তাহলে এটা কি ধরণের সামরিক অভ্যুত্থান? পৃথিবীরে সব দেশেই সামরিক অভ্যুত্থানে সেনা প্রধানেরা ক্ষমতায় বসেন। পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থানে সেনা প্রধান আইয়ুব ক্ষমতায় বসেছিলেন। তুরস্কে মেন্দারেসের রাজনৈতিক সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে সেনাপ্রধান জেনারেল গার্সেল তার সহকর্মীদেরসহ ক্ষমতায় বসেছিলেন। চিলিতে আলেন্দে সরকারকে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করে প্রেসিডেন্ট পদ দখল করেছিলেন জেনারেল পিনোচেট। বাংলাদেশেও একধরনের সামরিক অভ্যুত্থান বলা চলে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখলকে। তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থনে ও সহায়তায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে প্রথমে একজন শিখন্ডি বিচারপতিকে কিছুদিন ওই পদে রেখে শেষে নিজেই রাষ্ট্রপতি পদে বসেন।এই সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে বিচার করলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনাকে কি সামরিক অভ্যুত্থান বলা চলে ? যেখানে সামরিক বাহিনীর প্রধানসহ কোনো বাহিনী প্রধান এই অভ্যুত্থানে জড়িত ছিলেন না, এমন কি তাদের অধীনস্থ বাহিনী গুলোও নয়। তারা কেউ এর বেনিফিসিয়ারিও হননি। একমাত্র হয়েছেন তৎকালীন ডেপুটি সেনা প্রধান জিয়াউর রহমান।সন্দেহ নেই, ১৫ আগস্টের ঘটনা ছিলো চত্রান্তকারীদের সুপরিকল্পিত হত্যা চক্রান্ত। তাতে বিদেশি চক্রান্তকারীরাও যুক্ত ছিলো এবং এই চক্রান্ত্রের আসল লক্ষ্য ছিলো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকার পরিবর্তন নয়; কারণ, সামরিক বাহিনীর সকল অংশ এবং সকল প্রধানের সমর্থন চক্রান্তকারীরা পেতোনা। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল নায়কদের হত্যা এবং স্বাধীনতার মৌলিক চরিত্রকে ধ্বংস করে একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করা না গেলেও তাকে পাকিস্তানের ক্লায়েন্ট স্টেটে পরিণত করা।এই ব্যাপারে স্বার্থ ও উদ্দেশ্যগত একটা মৈত্রী প্রবাসী মুজিব সরকারের আগোচরে গড়ে উঠেছিল খোন্দকার মোস্তাকের রাজনৈতিক গ্র“প এবং জিয়াউর রহমানের একটি ক্ষুদ্র সামরিক ক্লিকের মধ্যে। দু’জনের মধ্যেই ছিলো অতি উচ্চাকাঙ্খা। জিয়াউর রহমানতো কালুর ঘাটে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করতে গিয়ে রেডিওর মাইক হাতে পেয়েই নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিলেন এবং মোশতাকও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের অধীনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ পেয়ে সন্তষ্ট ছিলেন না। মোশতাক এবং জিয়াউর রহমান দু’জনের স্ট্রং পিন্ডি এবং ওয়াশিংটন কানেকশন ছিলো। পনেরই আগস্টের চক্রান্তের সূত্রপাত বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীন হওয়ার আগেই মুজিব নগরে। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে তাজউদ্দীন সরকার মোশতাক ও জিয়াচক্রের ষড়যন্ত্রের কিছুটা আভাস পেয়েই জিয়াউর রহমানকে সেক্টর কমান্ডার পদ থেকে অপসারণ এবং তার জেড ফোর্সকে নিস্ক্রিয় করে ফেলেন। অন্য দিকে খোন্দকার মোশতাক আহমদ পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ থেকে অঘোষিত ভাবে অপসারিত হন। তার স্থলাভিষিক্ত হন আবদুস সামাদ আজাদ।সুতরাং ইতিহাসের বিচারে এবং বাস্তবতার নিরিখে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের শেষ রাতের বর্বর হত্যাকান্ডকে কিছুতেই সামরিক অভ্যুত্থান বলা চলেনা। সামরিক অভ্যুত্থান বলে তাতে নেতৃত্ব দিতেন সেনা প্রধানসহ বিভিন্ন বাহিনীর সকল প্রধান এবং ইনফেন্ট্রি, আর্টিলারিসহ সেনা বাহিনীর সকল অংশ। সেনাপ্রধানদের অনুপস্থিতিতে কয়েকজন কর্নেল ও চাকুরিচ্যুত মেজর কয়েকটি গোলাবারুদহীন ট্যাঙ্ক নিয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনের দিকে এগুতো না। ঘটনাটি আকস্মিকভাবে ঘটে যাওয়ার পরও সেনা প্রধানেরা এবং মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্রচালনায় ট্রেনিং প্রাপ্ত আওয়ামী লীগের যুব নেতারা সাহসী হয়ে এই ঘাতকদের প্রতিরোধে এগিয়ে এলে ঘাতকদের পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হতো।এই হত্যা চক্রান্তের পরিকল্পনাটি স্বাধীনতার পরপরই মুজিব নগর থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়েছিলো। মোশতাক চক্রে ফারুক, ডালিম, হুদা, রশিদ প্রমুখ এক জোটে। অন্যদিকে জে. জিয়া সেনাবাহিনীকে তার নিয়ন্ত্রনে নিয়ে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে পারবেন না জেনে ফারুক, রশিদ, ডালিমদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ গড়ে তোলেন। অন্যদিকে নবগঠিত জাসদের ইনফেনটাইল রেভুলশনারি এডভেঞ্চারেও তিনি উসকানি দিতে থাকেন। জিয়াউর রহমানের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে পরে নির্মমভাবে ফাঁসিকাষ্ঠে প্রাণ দেন কর্নেল (অব.) তাহের। তিনি দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তি এবং গণবাহিনী গঠনের লক্ষ্যে একটি সিপাহি জনতার অভ্যুত্থান ঘটাতে চেয়েছিলেন এবং এই কাজে জিয়াউর রহমান তাকে সাহায্য করবেন ভেবেছিলেন। জিয়া তাকে সেই আশ্বাসই দিয়েছিলেন এবং তাহের তাকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করেছিলেন। জিয়াউর রহমানকে বিশ্বাস করার ফল কর্নেল (অব.) তাহের হাতে হাতে পেয়েছিলেন। তার বিপ্লব ব্যর্থ হয় এবং জিয়ার নির্দেশে ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিচারে তাকে প্রাণ দিতে হয়।১৯৭৫ সালে আগস্ট মাসে বাংলাদেশে কোনো সামরিক অভ্যুত্থানই ঘটেনি। যা হয়েছিল, তাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের একটি ধারাবাহিকতার সাফল্য বলা চলে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক চক্রগুলোও এই ষড়যন্ত্রে এসে যোগ দিয়েছিলো। এই চক্রান্তে বুদ্ধির খেলায় জিয়াউর রহমানের কাছে মোশতাক হেরে যান। বুদ্ধিমান বানর যেমন নিজে দই খেয়ে ছাগলের দাড়িতে হাত মুছে রেখে তাকে গৃহস্থের হাতে মার খাইয়েছিলো, তেমনি জিয়াউর রহমান ১৫ আগস্টের সব দায় দায়িত্ব মোশতাক ও তার ফারুক-ডালিম গ্যাঙের মাথায় চাপিয়ে দিয়ে তাদের কিছুদিন বঙ্গভবনে রাজা রাজা রাজা খেলতে দিয়ে পরে দড়ি গুটিয়ে নিয়েছেন এবং দীর্ঘ পরিকল্পনার সাফল্য হিসেবে নিজে মসনদ দখল করেছেন।মোশতাক আহমদকে বঙ্গভবনে তিনমাসের নবাবি করতে দিয়ে এবং আওয়ামী লীগের ভীত হতভম্ব একদল মন্ত্রীকে বন্দুকের নলের মুখে তার মন্ত্রী হতে বাধ্য করার মূলে চক্রান্তকারীদের আসল উদ্দেশ্য ছিলো ১৫ তারিখের হত্যাকান্ডটি আওয়ামী লীগই ঘটিয়েছে এবং দেশে মুজিববিহীন আওয়ামী সরকারই ক্ষমতায় রয়েছে এই প্রচারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করা এবং এই ধুম্রজালের সুযোগে সময় নিয়ে শক্ত অবস্থানে দাড়িয়ে ক্ষমতার মসনদে বসা। তারা সেটাই করেছেন।আওয়ামী লীগের চার প্রধান নেতা তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল, কামরুজ্জামান, মনসুর আলি, যারা চক্রান্তকারীদের পাশার দান উল্টে দিতে পারতেন, তাদের জেলে বন্দি করে হত্যা করা হয়। ১৯ নভেম্বর বিবিসি’র আলোচনায় ঢাকার বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী ১৫ আগস্টের ঘটনায় দায় দায়িত্ব আওয়ামী লীগের উপর চাপানোর জন্য যেসব কথা বলেছেন, তা আমার উপরের বিশ্লেষণটাই সত্য প্রমাণ করে। উনিশে নভেম্বরের আলোচনাতে ঢাকার বুদ্ধিজীবীর এই বক্তব্যই ছিলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকান্ডের পর আজকের বিএনপি’র পূর্বশুরীদের অবিরাম প্রচারণা।বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন সেনাবাহিনী থেকে অপসারিত জুনিয়ার অফিসার এবং কেউ কেউ তখনো চাকুরিতে ছিলেন। জাতির জনক এবং রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করতে গিয়ে এরা মুষ্টিমেয় সেনা সদস্যের সমর্থন ও সহায়তা পেয়েছে, কিন্তু বাকি চক্রান্তটাই ছিলো গোপন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের। এর বিচার কি কারণে সামরিক আইনে করতে হবে ? দেশের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থা কি তার জন্য যথেষ্ট নয় ? চিলিতে যে সেনা প্রধান সত্য সত্যই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, ক্ষমতাচ্যুতির পর তারতো সামরিক আইনে বিচার হয়নি, হয়েছে দেশের প্রচলিত আইনে গঠিত বিশেষ ট্রাইবুনালে।দক্ষিণ কোরিয়ার যে সেনা প্রধান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল ও নানা অভিযোগে বিচারে সোপর্দ হয়ে দন্ডিত হয়েছিলেন, তাকেও সামরিক আদালতে বিচার করা হয়নি। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার কেন সামরিক আইনে বা সামরিক আদালতে হতে হবে ? চল্লিশের দশকে নাৎসি নেতা ও সমর নেতাদের বিচারের জন্য গঠিত নুরেমবার্গ বিচার আদালত কি সামরিক আদালত ছিলো? বাংলাদেশে এসব প্রশ্নের জবাব বিএনপি নেতারা এবং তাদের অনুগ্রহভোজী বুদ্ধিজীবীরাই ভালো জানেন। বুঝহ লোক যে জানহ সন্ধান। লন্ডন।

Monday, November 23, 2009

৭২ এর সংবিধান বাঙালির জাতীয় বিশ্বাসের দলিলঃ লন্ডনে সংবিধান দিবসের সেমিনারে আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৭২ এর সংবিধান বাঙালির জাতীয় বিশ্বাসের দলিলঃ লন্ডনে সংবিধান দিবসের সেমিনারে আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ভিওবিডি, লন্ডন থেকেবাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়নের ৩৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে লন্ডনে আয়োজিত ’আজকের বাস্তবতায় ৭২ এর সংবিধানের প্রয়োজনিয়তা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশিষ্ট সাংবাদিক সাহিত্যিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বলেছেন, ৭২ এর সংবিধান বাঙালির জাতীয় বিশ্বাসের পবিত্র দলিল। এই দলিলকে যারা নষ্ট করেছে তারা জাতীয় শত্রু। তিনি বলেন, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার, বঙ্গবন্ধু ধর্ম নিরপেক্ষতাকে এভাবেই সজ্ঞায়িত করেছিলেন যা ৭২ এর সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ব। র্মনিরপেক্ষতাই সকল নাগরিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে। জনাব চৌধুরী উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধর্মের নামে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে জাতীয় অস্থিত্বই যে হুমকির মুখে পড়ে তার সর্বসাম্প্রতিক উদাহরণ পাকিস্তান। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর বাবার মত সাহসি হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, এই সরকারের মেয়াদের মধ্যেই ৭২ এর সংবিধান পূনঃপ্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে নিতে যা যা প্রয়োজন সবকিছু করতে হবে। তিনি ৪ঠা নভেম্বর সংবিধান দিবসকে প্রি ত বছর সরকারী ভাবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আহবান জানান। ১৬ নভেম্বর, সোমবার, বিকালে বাংলাদেশের প্র ম সংবিধান প্রণয়নের ৩৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে পূর্ব লন্ডনের মন্টিফিউরী সেন্টারে ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর সেক্যুলার বাংলাদেশ, ইউকে চ্যাপ্টার (একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, যুক্তরাজ্য শাখা) আয়োজিত এক সেমিনারে অতিথি আলোচকের বক্তব্যে জনাব আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী উপরোক্ত মন্তব্য করেন।সেমিনারে মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বিশিষ্ট সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির। ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর সেক্যুলার বাংলাদেশ, ইউকে চ্যাপ্টারের সভাপতি ডাঃ বি বি চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে সমমানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ডঃ এম. সাইদুর রহমান খান। অতিথি আলোচক হিসেবে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতা মেজর জেনারেল (অবঃ) কে এম শফি উল া, কমনওয়েলথ জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক সভাপতি সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার এবং লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার গিয়াস উদ্দিন। যুক্তরাজ্য নির্মূল কমিটির পক্ষে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের অন্যতম উপদেষ্টা সাংবাদিক আবু মুসা হাসান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাংগঠনিক সম্পাদক আহাদ চৌধুরী বাবু।মলূ আলোচকের বক্তব্যে শাহরিয়ার কবির বলেন ৭২ এর সংবিধান অনুসারে পরিচালিত হলে বাংলাদেশ আজ সাম্প্রদায়িক যুদ্ধাপরাধীদের চারণ ক্ষেত্র হতো না। ৭২ এর সংবিধান ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ট সংবিধান। ৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে এই আধুনিক প্রগতিশীল সংবিধানটিকেও হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি সদ্য স্বাধীন দেশে অল্প সময়ের মধ্যে এরকম একটি আধুনিক সংবিধান প্রণয়ণ তৎকালীন বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়ছিল। সংবিধানের মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল বাঙালির দীর্ঘদিনের আকাঙ্খার প্রতিফলন। রাজনীতি ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা রেখে রাষ্ট্রের উপর সকল ধর্মের মানুষের অধিকার যেভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধ,ু ঠিক তেমনি ভাবে গণতন্ত্রের সাথে সমাজতন্ত্রকেও মূলনীতি হিসেবে রেখে তিনি প্রমান করেছিলেন গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র একে অপরের পরিপুরক। তৎকালীন সময়ে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে গণতন্ত্র না থাকায় বঙ্গবন্ধুর এই নতুন দর্শনও বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছিল। শাহরিয়ার কবির বলেন, বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক এই সংবিধানটিকে বার বার কাটা ছেড়া করে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িকতাকে নির্বাসনে দিয়ে সংবিধানটিকে একটি সাম্প্রদায়িক সংবিধানে পরিণত করার চেষ্টা হয় ৭৫ পরবর্তী সরকারগুলোর আমলে । তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর যাবতই একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ৪ঠা নভেম্বরকে সংবিধান দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। এ বছর দেশের বাইরের বিভিন্ন শাখাও দিবসটি পালন করছে।সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার বলেন, একটি অশুভ মহলের স্বার্থেই ৭২ এর সংবিধানকে বার বার কাটা ছেড়া করে বাংলাদেশকে আজ জঙ্গি রাষ্ট্রের কাতারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একাধিক দল এবং সরকারও এই অপকর্মে মদদ দিয়েছে। তিনি বলেন, ৭২ এর সংবিধান শুধু পূণঃপ্রতিষ্ঠাই নয়, যারা আমাদের এই পবিত্র দলিল কে ধর্ষণ করেছে তাদেরও বিচার করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অবঃ) কে এম শফি উল্লা বলেন, ৭২ এর সংবিধানের অনুপস্থিতির কারনেই সাম্প্রদায়িক যুদ্ধাপরাধীরা আজ এত শক্তিশালী। সংবিধানে ধর্মের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গড়া যতদিন নিষিদ্ধ ছিল ততদিন জামাতের মত যুদ্ধাপরাধী দল মাথা তুলতে পারেনি। এই সংবিধানকে ধ্বংস করার মাধ্যমেই শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের পুনঃর্বাসন।তিনি প্রবাসী বাঙালিদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, যে যার অবস্থান থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করুন, বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার মাধ্যমেই আমাদের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে । সাবেক হাইকমিশনার গিয়াস উদ্দিন স্বল্প সময়ে রচিত ৭২ এর সংবিধানকে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আশা আকাঙ্খার দর্পণ আখ্যায়িত করে বলেন, ভারতের প্র ম সংবিধান রচনা করতে সময় লেগেছিল ৫ বছর, পাকিস্তানের ৯বছর। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে সংবিধানটি রচিত হয়েছিল সেটি স্বীকৃতি পেয়েছিল বিশ্বের অন্যতম একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল সংবিধান হিসেবে। এখানেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দুরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়।সমমানিত অতিথির বক্তব্যে হাইকমিশনার ডঃ এম সাইদুর রহমান খান বলেন, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি ও যুদ্ধাপরাধীদের আজকের বিপদজনক উত্থান ৭২ এর সংবিধানের অনুপস্থিতিরই ফল । ৭২ এর সংবিধান অনুসারে দেশ পরিচালিত হলে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক যুদ্ধাপরাধীদের চারণ ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতি আজ অস্থিতিশীল হতো না। তিনি বলেন, সময়ের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন হতেই পারে, তবে সংবিধানের মূল স্তম্বগুলো ঠিক রেখেই তা করতে হয়। হাইকমিশনার সেমিনারে উপস্থিত সূধীজনদের আশ্বস্থ করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রি পার্লামেন্টে ইতোমধ্যে ৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। আশাকরি সবার সমিমলিত প্রচেষ্ঠায় এটি সম্ভব হবে। তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় নিতে বর্তমান সরকার সম্ভব সব কিছু করবে বলেও প্রবাসীদের আশ্বস্থ করেন।অনুষ্ঠান শেষে আলোচকরা উপস্থিত সূধীজনদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সেমিনারে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার গুরুত্বপণূর্ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারের শেষ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মানবাধিকার কর্মী আব্বাস ফয়েজ কিছুক্ষনের জন্য এসে বক্তাদের বক্তব্য শোনেন।

Thursday, November 19, 2009

'Justice must not only be done, it must be seen to be done'..........true after waiting fo long 34 years Bangladeshi Nation get justice. It's a historical judgement. The country is relieved from black history forever and justice is restored", Tasmim Nehreen Thakur

আপিল খারিজ ৭ আসামি পলাতক বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ।। দিদারম্নল আলম ও অপূর্ব আলাউদ্দিন ।। অপেৰার প্রহর শেষ হলো। বাঙ্গালি জাতি মুক্তি পেল ৩৪ বছরের কলঙ্ক, গস্নানি ও দায়বদ্ধতার হাত থেকে। প্রত্যাখ্যাত হলো স্বীকৃত খুনিদের আপিল। যাদের নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছিল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, মহান স্বাধীনতার ঘোষক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রাণ তার সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, ১০ বছরের অবুঝ শিশু রাসেলসহ আরো অসহায় নারী-পুরম্নষের জীবন প্রদীপ। মাতৃভূমির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাতুল্য সেই ঘটনায় শুধু বাঙ্গালি জাতি নয়, সৱম্ভিত হয়েছিল পুরো বিশ্ব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কলঙ্কিত ঘটনায় দায়ের করা মামলার চূড়ানৱ নিষ্পত্তি করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার জনাকীর্ণ আদালতে খারিজ করে দেয়া হলো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি ৫ আসামি লে. কর্নেল (বরখাসৱ) সৈয়দ ফারম্নক রহমান, লে.কর্নেল (অব:) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, লে. কর্নেল (অব:) মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি), মেজর (অব:) এ কে এম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার) ও মেজর (অব.) বজলুল হুদার আপিল। একইসঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের ওপর যে স্থগিতাদেশ ছিল তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ৭ আসামির (এদের কেউই আপিল করেনি) ৰেত্রেও ফাঁসির রায় বহাল থাকল। পলাতকরা হলো লে. কর্নেল (অব.) এসএইচ এমবি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) শরীফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে. কর্নেল (অব.) এম এ রাশেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মাজেদ, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ও লে. কর্নেল (অব:) মোঃ আজিজ পাশা। অবশ্য সর্বশেষ আসামি পলাতক থাকা অবস্থায় ২০০২ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা যান। আদালতের ঘোষিত এই রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হলো অপরাধীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের কোন কালো আইনের সহায়তায় রৰা করা সম্ভব নয়। এই রায় দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ৰেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মত ব্যক্ত করেছেন দেশের শীর্ষ আইন কর্মকর্তারা। নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়। তবে এই রায়ের বিরম্নদ্ধে আসামিরা সুপ্রিম কোর্টে পুনর্বিবেচনার আবেদন (রিভিউ পিটিশন) দাখিল করবে বলে তাদের কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন। এদিকে রায় ঘোষণার পর নিহতদের স্মরণে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে উপস্থিত সরকার পৰের কৌঁসুলি ও বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করেন। সকাল থেকে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা জড়ো হতে থাকেন। রায় ঘোষণাকালে প্রধান বিচারপতির ১ নম্বর বিচার কৰে মানুষের তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। রায় ঘোষণার সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, প্রতিমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য একেএম রহমতউলস্নাহসহ বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত ছিলেন। আসামিদের আপিল আবেদন খারিজের পরপরই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মিছিলে শেস্নাগানে মুখর হয়ে ওঠে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণ। এ সময় আদালতের ভিতর থেকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শেস্নাগানে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু আইন ছাত্র পরিষদের আইনজীবীরা। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় সংসদ, বঙ্গবন্ধু ডিপেস্নামা প্রকৌশলী পরিষদের ব্যানারে এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে মিছিল করতে দেখা গেছে। সুপ্রিমকোর্টের রায়ে যা বলা হয়েছে ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিশেষ বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি পাঁচ আসামির লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে। ৫টি যুক্তি বিবেচনায় নিয়ে লিভ-টু আপিল মঞ্জুর করে ছিল আদালত। গতকাল সুপ্রিমকোর্ট ওই ৫টি বিষয়ের ওপর পর্যবেৰণ দিয়ে আসামিদের আপিল খারিজ করে দেন। সুপ্রিমকোর্টের রায়ে বলা হয়, লিভ-টু-আপিল মঞ্জুরের প্রথম যুক্তি ছিলঃ হাইকোর্টের দ্বিধাবিভক্ত রায় নিষ্পত্তিতে তৃতীয় বিচারপতি পুরো রায় বিবেচনা না করার পরিবর্তে ৬ জনের বিষয়টি নিষ্পত্তি করে আইনের ব্যত্যয় বা মৌলিক ভুল করেছেন কিনা? গতকাল সুপ্রিমকোর্ট তার রায়ে এ বিষয়ের ওপর পর্যবেৰণ দিয়ে বলেছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৮ ও ৪২৯ ধারায় স্পষ্টত উলেস্নখ আছে যে, হাইকোর্টের তৃতীয় বিচারপতি কোন কোন বিষয় বিবেচনায় নিতে এবং শুনতে পারবেন। এ ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন। এটা তার নিজস্ব এখতিয়ার। ফলে এই মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের দ্বিধাবিভক্ত রায়ে যে ৬ আসামির ব্যাপারে দুইজন বিচারপতির মধ্যে মতভেদ ছিল, কেবল সেই ৬ জনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্টের তৃতীয় বিচারপতি কোন ভুল করেনি। দ্বিতীয় যুক্তি ছিলঃ মামলা দায়েরে ‘বিলম্ব’ স্বাভাবিক বলে নিম্ন আদালতের পর্যবেৰণ যথার্থ কিনা? এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের মত হচ্ছেঃ রাষ্ট্রপৰ বিলম্বে মামলা দায়েরের ৰেত্রে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞ দায়রা জজ ও হাইকোর্টের বিচারপতিগণ সেটা গ্রহণ করেছেন। হত্যাকান্ড ঘটনায় মামলা দায়েরের ৰেত্রে বিলম্ব অযৌক্তিক নয়। তৃতীয় যুক্তি ছিলঃ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ‘সেনা বিদ্রোহ’ না নিছক হত্যাকান্ড এবং অভিযুক্তদের সাধারণ আদালতে বিচার করার এখতিয়ার আছে কিনা? এ প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের পর্যবেৰণ হলোঃ সেনা আইনের ৫৯(২) ধারায় হত্যার বিষয় বলা হয়েছে, হত্যাকারী যদি ‘এ্যাকটিভ সার্ভিস-এ থাকে তাহলে সেনা আইনে বিচার করতে হবে। কিন্তু আপিলকারীরা ‘এ্যাকটিভ সার্ভিস’-এ ছিলেন না। এছাড়া সেনা আইনের ৮(২) ধারা অনুযায়ী এটি একটি বেসামরিক অপরাধ (সিভিল অফেন্স)। তাই সেনা আইনের ৯৪ ধারা মোতাবেক আপিলকারীদের প্রচলিত আইনে বিচারে কোন বাধা নেই। চতুর্থ যুক্তি ছিল ঃ তৎকালীন সরকারকে উৎখাত বা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের আওতায় পড়ে কিনা? এতে সুপ্রিম কোর্ট রায়ে বলেছে, আসামি পৰের কৌঁসুলিগণ এমন কোন যুক্তি দেখাতে পারেননি যে, সেনা বিদ্রোহের ফলশ্রম্নতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। তাই আদালতের মত হচ্ছে তৎকালীন সরকারকে উৎখাত করার জন্য এটা সেনা বিদ্রোহের কোন ষড়যন্ত্র ছিল না। এটা নিছক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ষড়যন্ত্র ছিল। পঞ্চম যুক্তি ছিল ঃ লিভ টু আপিল মঞ্জুরের ৰেত্রে বিচার্য বিষয় ছিল রাষ্ট্রপৰ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তা ছিল ‘সিরিয়াস মিসক্যারেজ অব জাস্টিজ’। এৰেত্রে সুপ্রিম কোর্ট মত দিয়েছে যে, সাৰ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিগণ নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখেছেন এবং রায়ে হত্যার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে রাষ্ট্রপৰ প্রমাণ করতে পেরেছে। আপিলকারীর কৌঁসুলিরা (আসামি পৰ) তাদের পৰে যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে আমরা হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের ওপর হসৱৰেপের যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ দেখি না। এছাড়া আপিলকারীর কৌঁসুলিরা আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বাতিল বা সাজা কমানোর ৰেত্রে যথাযথভাবে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালত ও হাইকোর্টের বিচারকগণ আসামিদের বিরম্নদ্ধে যে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন তাতে আমরা কোন হসৱৰেপ করব না। এসব কারণে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি আসামিদের দায়ের করা আপিলগুলো খারিজ করা হল। একইসঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের ওপর যে স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছিল তাও প্রত্যাহার করা হল। রায় ঘোষণা করলেন যারা বিচারপতি এম তাফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গতকাল বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে এজলাসে বসেন। বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি এম তাফাজ্জল ইসলাম বেলা ১১টা ৪৬ মিনিট থেকে ১২টা পর্যনৱ সংৰিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর চার সদস্য বিচারপতি মোঃ আব্দুল আজিজ, বিচারপতি বি কে দাস, বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন ও বিচারপতি এস কে সিনহা এজলাসে ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তারা এজলাস ত্যাগ করেন। এর আগে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে তাদেরকে সুপ্রিমকোর্টে নিয়ে আসা হয়। সকাল ১১টায় রায় ঘোষণার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের ৪৫ মিনিট পর আদালত বসে। প্রধান বিচারপতির ১ নম্বর কৰে সকাল ১০টা থেকে আইনজীবীদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়। কৰের প্রবেশমুখে বসানো হয় ‘আর্চওয়ে’। এ সময় সকলের দেহ তলস্নাশি করে ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। রায় ঘোষণার সময় প্রায় নয়শতাধিক আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট জুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় চূড়ানৱ রায় ঘোষণাকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গতকাল কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনি গড়ে তোলা হয়। এ সময় কোর্ট প্রাঙ্গণ ছিল অত্যনৱ শানিৱপূর্ণ। সকালের দিকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনি উপেৰা করে সুপ্রিম কোর্টের দেয়াল টপকে প্রবেশকালে দুই যুবক পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। পুলিশ তাদের শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। পুরো এলাকাজুড়ে র‌্যাব, পুলিশ, মহিলা পুলিশ, আনসারসহ আইন-শৃঙ্খলা রৰাকারী বাহিনীর সহস্রাধিক সদস্য মোতায়েন করা হয়। র‌্যাব-পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা সংস্থার তিনশতাধিক সদস্যও মোতায়েন ছিল। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিৰণপ্রাপ্ত পুলিশের ‘সোয়াত’ টিম সেখানে অবস্থান নেয়। এছাড়াও র‌্যাবের ডগ স্কোয়াড দিয়েও তলস্নাশি চালানো হয়। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ এবং কোর্টের নি্নিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৪টি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বসানো হয়। এসব ক্যামেরায় ধারণকৃত চিত্র সার্বৰণিক মনিটরিং করতে আদালতের প্রধান ফটকে একটি পুলিশ টিম কাজ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়কে ঘিরে গতকাল সকাল থেকেই আইনজীবী, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ এবং উৎসুক জনতা আদালতে ভিড় করতে থাকে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও লোক সমাগম বাড়তে থাকে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিটি গাড়ি ও ব্যক্তিগত তলস্নাশি করে তাদের আদালতে ঢুকতে দেয়। আদালতের অভ্যনৱরে চার সৱর বিশিষ্ট নিরাপত্তা বেষ্টনি গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রতিটি স্থানে আইডি কার্ড দেখে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে লোকজনকে আদালতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। আদালতে প্রতিটি ফ্লোরে পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও মোতায়েন করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম সংশিস্নষ্ট ৫ বিচারপতি র‌্যাব ও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সকাল পৌনে ১০টার দিকে আদালতে প্রবেশ করেন। রায়কে কেন্দ্র করে শুধু আদালত প্রাঙ্গণেই নয়, এই বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সংশিষ্ট আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্য বিচারপতিদেরও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্টের অধিকাংশ বিচারপতিকে একজন করে পুলিশ দেয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এক নম্বর বিচার কৰে পৌনে ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পরপর সাধারণ আইনজীবী ও উৎসুক জনতা এ রায় কার্যকর করার জন্য আদালত প্রাঙ্গণে মিছিল শুরম্ন করে। মিছিল শুরম্নর পর বাইরের লোকজন যাতে ঢুকতে না পারে সেজন্য হাইকোর্টের প্রধান ফটক দুইটি বন্ধ করে দেয়া হয়। দীর্ঘ সময় বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ৩৪ বছর পর শেষ হলো মামলার বিচার কাজ। কিন্তু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, বিচারপতিদের বিব্রতবোধ ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতির অভাবে দীর্ঘ সময় বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধুর রিসিপশনিস্ট-কাম-রেসিডেন্ট পিএ আফম মুহিতুল ইসলাম বাদি হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে সংঘটিত জঘন্য ও বর্বর ঘটনায় ২৩ জনকে আসামি করে ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করেন। ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর এই মামলা দায়ের করা হয়। এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয় জাতীয় সংসদে। এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে যাতে আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপিত না হয়। পরে দীর্ঘ তদনৱ শেষে চার্জশীট দাখিল করেন মামলার তদনৱকারী কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দ। দণ্ডবিধির ১২০-বি/৩০২/১৪৯/৩২৪/৩৪/৩০৭/ ২০১/৩৮০/১০৯ ধারা মোতাবেক এই চার্জশীট দাখিল করা হয়। এরপর ঢাকার বেগম বাজার ও নাজিমউদ্দিন রোডের মাঝখানে অবস্থিত সাবেক কারারৰী ব্যারাকে শুরম্ন হয় এই নৃশংস ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার কাজ। নিম্ন আদালতের রায় দীর্ঘ ১৫১ কার্যদিবসে ৬১ জনের সাৰ্য গ্রহণ শেষে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ গোলাম রসুল ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ১৫ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় প্রদান করেন। ৫ জনকে খালাস দেন। রায়ে আসামিদের প্রকাশ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যার কথা বলা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল (বরখাসৱ) সৈয়দ ফারম্নক রহমান, লে. কর্নেল (অব:) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, লে. কর্নেল (অব:) মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারী), মেজর (অব:) একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার), মেজর (অবঃ) বজলুল হুদা, লে.কর্নেল (অব.) এসএইচ- এমবি নূর চৌধুরী, লে.কর্নেল (অব.) শরীফুল হক ডালিম, লে.কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে.কর্নেল (অব.) এম এ রাশেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মাজেদ, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, লে. কর্নেল (অব:) মো: আজিজ পাশা, মেজর (অব.) আহমেদ শরীফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব:) মো: কিসমত হাশেম ও ক্যাপ্টেন (অব:) নাজমুল হোসেন আনসার। তবে বিচারিক আদালত অনারারী ক্যাপ্টেন আব্দুল ওয়াহহাব জোয়াদ্দার, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, মিসেস জোবাইদা রশীদ, দফাদার মারফত আলী শাহ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ওরফে মোসলেমউদ্দিন খান ওরফে রফিকুল ইসলাম খানকে খালাস প্রদান করেন। এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৬ ধারা মোতাবেক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিম্ন আদালতের রায়সহ নথি হাইকোর্টে প্রেরণ করা হয়। একই সঙ্গে এ রায়ের বিরম্নদ্ধে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেন । আপিলের ওপর শুনানি গ্রহণে হাইকোর্ট বিভাগের একাধিক বিচারপতি বিব্রতবোধ করেন। হাইকোর্টের রায় পরে বিচারপতি মোঃ রম্নহুল আমিন ও বিচারপতি এ বি এম খায়রম্নল হককে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্সের ওপর ২০০০ সালের ২৮ জুন শুনানি গ্রহণ করেন। শুনানি গ্রহণ শেষে হাইকোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় প্রদান করেন। দ্বিধাবিভক্ত বেঞ্চের প্রথম বিচারপতি মো: রম্নহুল আমিন ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে খালাস দেন। এছাড়া বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারপতি এবিএম খায়রম্নল হক ১৫ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন। দ্বিধাবিভক্ত রায়ে দুইজন বিচারপতি ৯ আসামির ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছেন। ৬ জনের ব্যাপারে তারা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেননি। এরপর হাইকোর্টের তৃতীয় বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ৬ জনের বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন। তিনি তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান এবং ৩ জনকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। তৃতীয় বিচারপতি নিম্ন আদালতের দণ্ডপ্রাপ্ত মেজর (অব.) আহমেদ শরীফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) হাশেম কিসমত ও ক্যাপেন্ট (অব.) নাজমুল হোসেন আনসারের বিরম্নদ্ধে দেয়া ফাঁসির আদেশ বাতিল করেন। এরপর কারাবন্দী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি ২০০১ সালের ১৬ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের সংশিস্নষ্ট শাখায় হাইকোর্টের রায়ের বিরম্নদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতির অভাবে দীর্ঘ ৬ বছর লিভ টু আপিলের শুনানি বন্ধ ছিল। লিভ টু আপিল মঞ্জুর এরপর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ১৮ জুন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব:) একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদকে (ল্যান্সার) দেশে ফিরিয়ে আনেন। কারাগার থেকে গত ২৪ জুন তিনি হাইকোর্টের রায়ের বিরম্নদ্ধে আপিল করেন। পরবর্তীকালে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৭ আগস্ট আপিল বিভাগের বিশেষ বেঞ্চে আসামিদের দায়ের করা লিভ টু আপিলের শুনানি শুরম্ন হয়। ২৬ কার্যদিবসব্যাপী শুনানি শেষে ২৩ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এম তাফাজ্জল ইসলাম, বিচারপতি মোঃ জয়নুল আবেদীন ও বিচারপতি মোঃ হাসান আমীন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরম্নদ্ধে আসামিদের দায়ের করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিশেষ বেঞ্চ। পাঁচটি যুক্তি বিবেচনার জন্য মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামিদের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে বিশেষ বেঞ্চ। যুক্তিগুলো হচ্ছেঃ ১. বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ‘সেনা বিদ্রোহ’ না ‘হত্যাকাণ্ড’। ২. এই মামলায় সাৰীদের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী কিনা। ৩. মামলা দায়ের বিলম্ব স্বাভাবিক বলে নিম্ন আদালতের পর্যবেৰণ যথার্থ কিনা। ৪. হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের আওতায় পড়ে কিনা । ৫. হাইকোর্টের দ্বিধাবিভক্ত রায় নিষ্পত্তিতে তৃতীয় বিচারক পুরো রায় বিবেচনা করার পরিবর্তে ৬ জনের বিষয়টি নিষ্পত্তি করে ভুল করেছেন কিনা। নিয়মিত আপিলের শুনানি এরপর সর্বোচ্চ আদালতের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে অর্থাৎ একই বছরের ৩০ অক্টোবরের মধ্যে তারা সুপ্রিম কোর্টের সংশিস্নষ্ট শাখায় নিয়মিত আপিল করেন। ঐ সময় প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতি থাকার পরও সরকার এবং আসামিপৰ উদ্যোগ গ্রহণ না করায় আপিল শুনানি শুরম্ন করা সম্ভব হয়নি। এরপর ২০০৮ সালের মে মাসে আপিল বিভাগের বিচারপতি মোঃ হাসান আমীন অবসরে যান। ফলে পুনরায় বেঞ্চ পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতির অভাব দেখা দেয়। নিয়ম অনুযায়ী আপিল বিভাগের তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ কোন মামলার আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী কোন মামলা হাইকোর্ট বিভাগে শুনানির পর সেই বিচারপতি আপিল বিভাগে নিয়োগ পেলে তিনি আপিল বিভাগে উক্ত মামলা শুনানি করতে পারবেন না। কিনৱু মহাজোট সরকার ৰমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর আপিল বিভাগে মোট ৪ জন বিচারপতি নিয়োগ দেয়ায় বিচারকের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১১তে। ফলে কেটে যায় বিচারক সংকটের জটিলতা। এরপর গত ৪ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি এমএম রম্নহুল আমিন আপিল বিভাগের বিচারপতি এম তাফাজ্জল ইসলাম, বিচারপতি মোঃ আব্দুল আজিজ, বিচারপতি বি কে দাস, বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেন ও বিচারপতি এসকে সিনহার সমন্বয়ে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন আপিল শুনানির জন্য। গত ৫ অক্টোবর ওই বেঞ্চে এই হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি ৫ আসামি অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল (বরখাসৱ) সৈয়দ ফারম্নক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারী), একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার) ও মেজর (অবঃ) বজলুল হুদার আপিল শুনানি গ্রহণ করেন। ২৯ কার্যদিবসব্যাপী শুনানি গ্রহণ করে আদালত। শুনানিতে এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম, রাষ্ট্রপৰের প্রধান কৌঁসুলি এডভোকেট আনিসুল হক, অন্যতম কৌঁসুলি ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি, এডভোকেট আব্দুল মতিন খসরম্ন, এডভোকেট তৌফিক নেওয়াজ ও এডভোকেট এএফএম মেসবাহউদ্দিন বক্তব্য পেশ করেন। এছাড়া আসামি সৈয়দ ফারম্নক রহমান ও একে মহিউদ্দিন আহম্মেদের (আর্টিলারী) পৰে এডভোকেট খান সাইফুর রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানের পৰে এডভোকেট আব্দুর রেজ্জাক খান এবং একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার) ও মেজর (অবঃ) বজলুল হুদার পৰে ব্যারিস্টার আব্দুলস্নাহ আল মামুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপৰের আইনজীবী প্যানেল রাষ্ট্রপৰে মামলা পরিচালনার জন্য প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হকের নেতৃত্বে একটি আইনজীবী প্যানেল গঠন করা হয়। প্যানেলের অন্য সদস্যরা হলেন মোশাররফ হোসেন কাজল, তৌফিকা করীম, মমতাজ উদ্দিন মেহেদী, এনামুল করীম ইমন ও ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ আসিফ। এছাড়া তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, নূরম্নল ইসলাম সুজন, শ ম রেজাউল করিম, শেখ ফজলে নূর তাপস, মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম, আবু জাফর সিদ্দিকী, রবিউল আলম বদুকে নিয়োগ দেয় সরকার। এছাড়া এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলমের নেতৃত্বে রাষ্ট্রের একাধিক আইন কর্মকর্তা মামলা পরিচালনা প্যানেলে ছিলেন।

’৯৮-এ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশের মাটিতেই হত্যার প্রসৱাব দেয় ইসরায়েলি ভাড়াটে সেনা ১১ বছর পর মুখ খুললেন রাষ্ট্রদূত ওয়ালি উর রহমান

জেলহত্যার রাতেই বিশেষ বিমানে ব্যাংককে নেয়া হয় ঘাতকদের শাহজাহান আকন্দ শুভ ও বিপস্নব বিশ্বাস:

১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় ৪ নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার পরই বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের পাকিসৱান থেকে আসা একটি বিশেষ বিমানে রেঙ্গুন হয়ে ব্যাংককে নেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর বিদেশ পলাতক খুনিদের বিদেশের মাটিতেই হত্যা করতে ’৯৮ সালে বাংলাদেশ সরকারকে ইসরায়েলি ভাড়াটে সেনা (মার্সেনারি) প্রসৱাব দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রসৱাবে রাজি হননি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেসময় খুনিদের দেশে ফেরত আনতে একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয়। সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত ওয়ালি উর রহমান ছিলেন ওই টাস্কফোর্সের প্রধান সমন্বয়ক। ঘটনার ১১ বছর পর গতকাল ওয়ালি উর রহমান বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফেরত আনতে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি ইতালি যায়। ইতালির রোমে অবস্থানকালেই ইসরায়েলি ভাড়াটে সেনা (মার্সেনারি) কর্নেল জ্যাক আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা পৃথিবীর যে দেশেই পালিয়ে থাকুক আমরা তাদের হত্যা করব। কিন্তু তার বিনিময়ে আমাদের মোটা অংকের ডলার দিতে হবে। আমি ঘটনাটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করার পর তিনি সরাসরি এ প্রসৱাব নাকচ করে দেন। শেখ হাসিনা তখন আমাকে বলেছিলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হত্যা নয়। আমরা চাই খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে।’ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ’৯৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিজিএফআই, এনএসআই ও সিআইডির সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছিল। এই টাস্কফোর্সের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন ওয়ালি উর রহমান। সেসময় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে আনতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চষে বেড়ায় টাস্কফোর্সের সদস্যরা। এসময় ওয়ালি উর রহমানসহ টাস্কফোর্সের অন্য সদস্যদের অসংখ্যবার হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল। ওয়ালি উর রহমান বলেন, ‘লিবিয়াতেই ছিল বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রধান ঘাঁটি। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলহত্যার রাতেই পাকিসৱান থেকে আসা একটি ফকার বিমানে খুনিরা স্বপরিবারে রেঙ্গুন হয়ে ব্যাংকক যান। খুনিদের অনেকেরই পাসপোর্ট না থাকায় বাংলাদেশ সরকারের একজন সরকারি কর্মকর্তাকে দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করে ৪ দিনের মাথায় লিবিয়াতে পাঠায়। পরে সেখান থেকে খুনিরা পাকিসৱান, সৌদি আরব, বেইজিং, কেনিয়া, হংকংসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি দূতাবাসে চাকরি শুরু করে।’ ১৯৯৭ সালের শুরুতে খুনিদের খোঁজে আফ্রিকার কেনিয়া ও জিম্বাবুইয়ে সফরে যান ওয়ালি উর রহমান ও এনএসআইয়ের তৎকালীন ডিজি কাজী মশিউর রহমান। বঙ্গবন্ধুর খুনি শরিফুল হক ডালিম তখন কেনিয়াতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে ওয়ালি উর রহমান ও মশিউর রহমান নাইরোবিতে বাংলাদেশের তৎকালীন হাইকমিশনার আফছারুল কাদেরকে সঙ্গে নিয়ে সেসময় কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট ডেনিয়েল আরাপ মুইয়ের সঙ্গে দেখা করেন। ডালিমকে প্রথমে বাংলাদেশে হসৱানৱরের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তা থেকে সরে আসেন মুই। ওয়ালি উর রহমান বলেন, ডালিম তখন কেনিয়ায় মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা খুলে বসেছে। ডালিম তার ব্যবসা থেকে প্রতিমাসে প্রেসিডেন্টের অফিসে অর্থ দিত।’ টাস্কফোর্সের দুই সদস্য নাইরোবি থেকে পরে বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি আজিজ পাশার খোঁজে হারারেতে যান। চাকরিবিধি লঙ্ঘনের দায়ে আজিজ পাশা তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরি থেকে বরখাসৱ হন। পরে জিম্বাবুয়েতে ব্যবসা শুরু করেন। ওয়ালি উর রহমান বলেন, ‘সেখানে শুরুতেই দেখা দেয় বিপত্তি। প্রেসিডেন্ট মুগাবের সঙ্গে দেখা করতে ঘুষ দাবি করেন তার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর মেয়ে ও তার সেক্রেটারি। শেষ পর্যনৱ এক হাজার ডলার ঘুষ দিয়ে তারা দেখা করেন রবার্ট মুগাবের সঙ্গে। মুইয়ের মতোই প্রথমে মুগাবে খুনি আজিজ পাশাকে ফেরত দিতে রাজি হলেও পরে তা থেকে সরে আসেন। পরে পলাতক অবস্থায় ২০০১ সালে জিম্বাবুইয়েতেই মারা যান আজিজ পাশা। ওয়ালি উর রহমান আরো বলেন, ‘কেনিয়া ও জিম্বাবুয়ে মিশন থেকে আমরা খুনি আব্দুর রশিদের খোঁজে লিবিয়া যাওয়ারও সিদ্ধানৱ নেই। বিষয়টি টের পেয়ে লিবিয়া সরকার আমাদের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে তখন আমি লিবিয়ার পার্লামেন্টের তৎকালীন স্পিকার এবং পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুর রহমান আল শালগামের সহায়তা চাই। তিনি জনাব রহমানকে মাল্টা হয়ে স্টিমারে করে লিবিয়ায় যাওয়ার পরামর্শ দেন। ইতোমধ্যেই খুনী রশিদ লিবীয় নেতা গাদ্দাফির গোয়েন্দা প্রধান এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবু সালেমের সঙ্গে বেনগাজিতে একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মের ব্যবসা শুরু করেছেন। ততদিনে লিবিয়ার প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন রশিদ। মাল্টা থেকে আমাদের লিবিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি টের পেয়ে রাতের অন্ধকারে ভাড়া করা খুনি নিয়ে রশিদ হাজির হয় মাল্টায়। খুনিরা আমাকে এবং মশিউর রহমানকে তাড়া করে। গোয়েন্দা সূত্রে খবর পেয়ে তখন মাল্টা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার হোটেল থেকে আমাদের উদ্ধার করে রাত সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে নিয়ে যায়। পরের দিন বিকেলে বিমানে আমরা ইতালি চলে যাই।’

শেষ হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর

শেষ হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর খোন্দকার মুহম্মদ খালেদ ।। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট। দু’ হাজার নয় সালের উনিশে নভেম্বর। দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর তিন মাস চার দিনের ব্যবধান। এই তিন দশকের প্রায় পুরো সময়টাই ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জন্য এক বিশাল প্রতীৰার প্রহর। অবসান হল তাঁর সেই দীর্ঘ প্রতীৰার। এই প্রতীৰা যে কত দুঃসহ, কত বেদনাসংকুল, তা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই ছোট্ট একটি পংক্তিতেই দৃশ্যমান-‘সময় ছুটে আসি, মনে বাসি ভয়- এসে দেখি যায় নাই তোমার সময়।’ আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই কঠিন দুঃসহ সময়ের এক ঐতিহাসিক অধ্যায় পার করলেন। এই সময়টা যে কি যন্ত্রণাময়, বেদনাকাতর ও সংগ্রামমুখর ছিল, তা তাঁর এই সুদীর্ঘকালের যাত্রা পরিক্রমা থেকেই দেদীপ্যমান। পঁচাত্তরের ১৪ আগস্ট রাতে শেখ হাসিনা ছিলেন ব্রাসেলসে তদানীনৱন রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাস ভবনে। এর আগে তিনি মূলতঃ শিশুপুত্র জয়ের তার বাবার কাছে যাবার জেদের কাছে নতি স্বীকার করেই বোন রেহানাকে নিয়ে পশ্চিম জার্মানীর ফ্রাংকফুর্টে যান ৩০ জুলাই। ফ্রাংফুর্ট থেকে সোজা ড. ওয়াজেদ মিয়ার কার্লসরম্নয়ে শহরের বাসা। ৯ আগস্ট সে সময়কার পশ্চিম জার্মানীর রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর আমন্ত্রণে তিনি বনে যান। এরপর বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের আতিথ্যে ব্রাসেলস, আমস্টারডামসহ কয়েকটি জায়গায় ঘোরাফেরা করেন। ১৪ আগস্ট রাতে তিনি বোন রেহানাসহ সপরিবারে সানাউল হকের ব্রাসেলসের বাসায়ই কাটান। ব্রাসেলসে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারী জাহাঙ্গীর সাদতের বাসায় ঐ রাতে তিনি নৈশভোজ সারেন। জাহাঙ্গীর সাদতের স্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনার সহপাঠিনী। কাজেই রাত বেশ ভালই কাটলো। তখনো কি তিনি জানতেন, পরদিন কী ভীষণ সংবাদ তাঁর জন্য অপেৰা করছে? ১৫ আগস্ট তাদের প্যারিস যাবার কথা। প্যারিস স্বপ্নের শহর। সৌন্দর্যের শহর। মোনালিসার শহর, ল্যুভর মিউজিয়ামের শহর তথা বিশ্বের কালোত্তীর্ণ শিল্প ও স্থাপত্য শিল্পের তীর্থ শহর। ওখানে গিয়ে কত মধুর সময় কাটানোর স্বপ্ন ছিল ওদের। কিন্তু ১৫ আগস্ট ভোরে খান খান হয়ে গেল সব স্বপ্ন। একটি টেলিফোনই ওলোট-পালট করে দিল সবকিছু। কূটনীতিক বন্ধুদের সূত্রে জানা যায়, বিপদের এই চরম মুহূর্তে সে সময়ে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, বন দূতাবাসের তারেক করিম, ব্রাসেলস দূতাবাসের জাহাঙ্গীর সাদত তাদের কূটনৈতিক প্রোটোকল ভুলে গিয়ে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টানৱ রেখেছিলেন। অন্যদিকে কোন কোন কূটনীতিকের আগের দিনের রূপ ভুলে গিয়ে পরের দিনেই চোখ উল্টিয়ে নেয়ার চিত্রও নাকি দৃশ্যমান ছিল। যা হোক, এরপর বন, নয়াদিলস্নী। শুরম্ন হল শেখ হাসিনার দীর্ঘ যাত্রা, প্রতীৰা আর পরবাসের পালা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে ঢাকা ফেরার চূড়ানৱ সিদ্ধানৱ গ্রহণের আগ পর্যনৱ শেখ হাসিনা সমসৱ শোককে ধীরে ধীরে শক্তিতে পরিণত করেছেন। তিনি জানতেন, সামনে তাঁর কঠিন দিন। তিনি নিজেকে নিয়ে ভাবেননি কখনো। তাঁর আপাদমসৱক চিনৱা ছিল জাতিকে নিয়ে। কিভাবে এ দুর্ভাগা জাতিকে সেনা শাসনের জগদ্দল পাথর থেকে মুক্ত করা যায়। তিনি জানতেন, সংগঠন ছাড়া কোন স্বপ্নই বাসৱবে রূপ দেয়া সম্ভব নয়। তাই সব সংশয় ঝেড়ে ফেলে স্থিরচিত্তে দলের কাণ্ডারী হওয়ার শক্ত সিদ্ধানৱও নিলেন এক পর্যায়ে। যদিও তিনি জানতেন-‘দুর্গম গিরি কানৱার মরম্ন, দুসৱর পারাবার, লংঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।’ দেশে ফিরে নতুন করে শুরম্ন করলেন তিনি তাঁর নবঅধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন। ১৯৮১-র ৩০ মে চট্টগ্রামে বিদ্রোহী সেনা সদস্যের আক্রমণে নিহত হলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এলেন আরেক সেনা শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি সেনা প্রধান থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করলেন। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সংগ্রামী জীবনের আরেক অধ্যায় শুরম্ন হল। শুরম্ন হলো এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। ১৯৯০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর এরশাদ সাহেব পদত্যাগ করেন প্রবল রাজনৈতিক গণআন্দোলনের মুখে। এরই ফলশ্রম্নতিতে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রম্নয়ারি একটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি ৰমতায় আসে। পাঁচ বছর পর আবার নির্বাচনের মাধ্যমে ৰমতায় আসে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে। বঙ্গবন্ধুকে যারা প্রত্যৰ ও পরোৰভাবে হত্যা করেছে, তারা তো এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করবে না। তাই ৯১-৯৫ শাসনামলে কেউ এ হত্যাকাণ্ডের বিচার আশা করেনি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ২০শে আগস্ট তদানীনৱন রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক একটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কোন প্রকার বিচারের পথও রম্নদ্ধ করে যান। ইতিহাসের ঘৃণীত ও কালো এ অধ্যাদেশটির নাম ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, ১৯৭৫ সাল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথে এটি ছিল প্রথম বাধা। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ৰমতায় এসেই উদ্যোগ নেন ইতিহাসের জঘন্যতম কালো আইন বাতিলের। সংসদ অধিবেশনে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পন্থায় তিনি এ অধ্যাদেশটি বাতিলে সৰম হন। এটি ছিল তার স্থির লৰ্য অর্জনের পথে একটি প্রথম সাফল্য। তিনি স্বচ্ছতা ও সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার বিশেষ ট্রাইবুনালের পরিবর্তে সাধারণ আইনে করার ব্যবস্থা করেন। তিনি ভাল করেই জানতেন, এ সিদ্ধানৱ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নিজ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, দৃঢ়চিত্ততা, ধৈর্য আর প্রজ্ঞাই তাঁকে সেদিন এ সিদ্ধানৱ নিতে সাহায্য করেছিল। তবে এ পথ কুসুমাসৱীর্ণ ছিল না মোটেই। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি আবার ৰমতায় আসে। পুরো পাঁচটি বছর ফের অপেৰার প্রহর গুনতে হয় শেখ হাসিনাকে। বিএনপি শাসনামল গেল। কিন্তু অগণতান্ত্রিক শাসন আবার চেপে বসলো। দু’টো বছর আরো নষ্ট করলো সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অবশেষে দৃশ্যতঃ কৃষ্ণ পৰের অবসান হল। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার দায়িত্বে এলো। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজে এতদিনের যত বাধা আর স্থবিরতা তার সবটাই দূর হলো। বিচার তার আপন গতিতে চললো। বিচারের রায় হল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মামলায় সুপ্রীম কোর্টের আজকের এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে শেষ হল শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রতীৰার প্রহর। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের এই রায়ের দ্বারা দেশে আইনের শাসন কায়েমের একটি আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার দেয়ালই শুধু অপসারিত হল না, অনৱতঃ একটি ৰেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রশাসনিক প্রজ্ঞা, লৰ্যের প্রতি অবিচল আস্থা ও দৃঢ়তা, মানবিক সহনশীলতা ও ধৈর্যের যে পরাকাষ্ঠা দেখালেন তা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আরো সমৃদ্ধ হয়ে দেশের সার্বিক কল্যাণে বৃহত্তর অবদান রাখুক, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা এই দিনে।
'Justice must not only be done, it must be seen to be done'..........true after waiting fo long 34 years Bangladeshi Nation get justice. It's a historical judgement. The country is relieved from black history forever and justice is restored"

শান্ত থাকুন: হাসিনা

শান্ত থাকুন: হাসিনা ঢাকা, নভেম্বর ১৯ বঙ্গবন্ধু মামলার আপিলের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ইতালি সফর সংক্ষিপ্ত করে রায়ের আড়াই ঘণ্টা আগে বৃহস্পতিবার সকালে দেশে ফিরেন তিনি। রায়ের সময় ছিলেন সরকারি বাসভবন যমুনায়। আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রবীণ নেতাও ছিলেন দলীয় প্রধান হাসিনার সঙ্গে। রায়ের পর প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেসসচিব নকিবউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরতেও বলেছেন। উপ প্রেসসিচব বলেন, প্রত্যাশিত রায় হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী সবাইকে শোকরানা নামাজ পড়ার আহ্বানও জানিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কারাবন্দি পাঁচ আসামির আপিল আবেদন খারিজ করেছে আপিল বিভাগ। আদালত ১২ আসামির সবার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে। যমুনায় ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি। আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, রায়ের খবর শুনেই দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েন শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল সদস্য ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে হানা দিয়ে বেশ কয়েকজন আত্মীয়-স�জনসহ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশ থাকায় সেদিন বেঁচে যান। বিদেশে অবস্থানরত রেহানা রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এর মধ্য দিয়ে ন্যায় ও সত্যের জয় হয়েছে।

ন্যায় ও সত্যের জয়: রেহানা

ন্যায় ও সত্যের জয় : শেখ রেহানা ঢাকা, নভেম্বর ১৯ ন্যায় ও সত্যের জয় হয়েছে- বঙ্গবন্ধু মামলার আপিলের রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ কথাই বলেছেন বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা। বাবা-মাসহ পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হারানোর ব্যাপারে অনেক বছর পর প্রকাশ্যে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানালেন। বৃহস্পতিবার সকালে বঙ্গবন্ধু মামলার আপিলের রায় ঘোষণা করে আপিল বিভাগ। আদালত ১২ আসামির সবার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিদেশে অবস্থানরত শেখ রেহানা টেলিফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এই মামলার রায় উচ্চ আদালতেও যে পুনঃস্বীকৃত হয়েছে এটাই বড়কথা। দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর পর হলেও যে বিচারকার্য শেষ হয়েছে,,,; সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,,,। "অন্যায় ও অপরাধ করলে তার যে বিচার ও শাস্তি আছে এবং হতে পারে, এটাই চিরন্তন সত্য। এখানে ন্যায় ও সত্যের জয় হয়েছে।" ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল সদস্য ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে হানা দিয়ে বেশ কয়েকজন আত্মীয়-স�জনসহ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশ থাকায় সেদিন বেঁচে যান। রেহানা বলেন, "সেদিন শাহাদাতবরণকারী সকলের আত্মার শান্তি কামনা করি। সেই নৃশংস ঘটনাবহুল হত্যার কালিমা মোচন হোক। এমন রক্তাক্ত স্মৃতির যন্ত্রণা ও শোক কাউকে যেন আর বইতে না হয়, এই প্রত্যাশা করি। দেশে শান্তি বজায় থাকুক। আমি সবার মঙ্গল কামনা করি।"
জাতি কলংকমুক্ত হয়েছে : ব্যারিস্টার তাপস ঢাকা, বাংলাদেশ, ১৯ নভেম্বর (বাসস) :
ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বলেছেন, আজ জাতির জন্য এক অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দিন। তিনি বলেন, সুদীর্ঘ ৩৪ বছর পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে জাতি কলংকমুক্ত হল।সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৫ জনের আপিল আবেদন আজ সুপ্রীম কোর্ট খারিজ করে দেয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তাপস একথা বলেন।তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এ রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো।তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে আবারো প্রমাণিত হল আইনের হাত থেকে কেউই পার পাবে না।বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে বাংলাদেশ যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির কনিষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস রায় ঘোষণার পর আজ দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আরো বলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালত আমাকে সর্বোৎকৃষ্ট উপহার দিয়েছে। আজ ১৯ নভেম্বর, আমার জন্মদিন- বঙ্গবন্ধু হত্যার ন্যায়বিচারই আমার জন্মদিনের বড় উপহার।তিনি বলেন, বাঙালি জাতির স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুকে ২৪ বছর ধরে লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছিল। আর জাতির জনকের হত্যার বিচার পাওয়ার জন্য আমাদেরকে ৩৪ বছর দ্বারে-দ্বারে ঘুরতে হয়েছে।স্বাধীন দেশের সর্বোচ্চ আদালত বাদি ও আসামী উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন করে এই রায় দেয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। ব্যারিস্টার তাপস বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা পরিচালনার জন্য যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন বিশেষ করে মামলার বাদি, তদন্ত কর্মকর্তা এবং সরকার পক্ষের কৌঁসুলিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো: আওয়ামী লীগ

'Justice must not only be done, it must be seen to be done'..........true after waiting fo long 34 years Bangladeshi Nation get justice. It's a historical judgement. The country is relieved from black history forever and justice is restored" জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো: আওয়ামী লীগ ঢাকা, নভেম্বর ১৯ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বঙ্গবন্ধু মামলার আপিলের রায়কে স্বাগত জানিয়ে আওয়ামী লীগ বলেছে, এর মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো। বৃহস্পতিবার বিকালে আওয়ামী লীগ তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়। এর আগে দুপুরেই আপিল বিভাগ পাঁচ আসামির আপিল আবেদন খারিজ করে ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, "আমরা এ রায়কে স্বাগত জানাচ্ছি। দীর্ঘ ৩৪ বছর প্রতীক্ষার পর বাঙালি জাতি এক কলঙ্ক কালিমা থেকে রক্ষা পেলো। প্রমাণিত হলো- যত শক্তিধরই হোক, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।" বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মদদ দেওয়ার জন্য সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক জোট শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদেরও সমালোচনা করেন আশরাফ। তিনি বলেন, "আত্মস্বীকৃত খুনিরা যেমন জাতির জনককে শারীরিকভাবে হত্যা করে, তেমনি জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান বলে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও আমাদের পবিত্র সংবিধানকে। "জেনারেল এরশাদ ১৯৮৬ সালে খুনি ফারুককে তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী করেন। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের প্রথমে 'প্রগস' এবং পরে ১৯৮৭ সালে ফারুক-রশিদকে দিয়ে ফ্রিডম পার্টি নামে একটি ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল গঠন করান। খালেদা জিয়া তার স্বামীর পথ অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কেবল আশ্রয়-প্রশ্রয়ই দেননি, তাদের রাজনৈতিকভাবেও পুনর্বাসিত করেন।" আওয়ামী লীগ শুক্রবার সারাদেশে সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনার কর্মসূচি দিয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদে মিলাদ, দোয়া ও শোকরানা নামাজ আদায় করা হবে বলে আশরাফ জানান। রায়ের খবর পেয়ে শেখ হাসিনা কেঁদেছেন জানিয়ে আশরাফ বলেন, "সে সময় আমরা তার পাশে ছিলান। তিনি (হাসিনা) বিশ্বাস করেন, সব হত্যাকাণ্ডের বিচার বাংলার মাটিতেই হবে।" রায়ের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আশরাফ বলেন, "উনি (শেখ হাসিনা) প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন, উনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন।" বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মোশতাক সরকার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করায় এর বিচারের পথ রুদ্ধ ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে। আশরাফ বলেন, "শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের অন্য সব নাগরিকের মতো পিতা, মাতা, ভাই হত্যার বিচারের অধিকারও পাননি। "অধিকার বঞ্চিত দুই বোন বাংলাদেশের মানুষের কাছে তো বটেই, বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন; ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক স�প্রদায়ের সহানুভূতি ও সমর্থন চেয়েছেন।" আশরাফ বলেন, জেল হত্যাকাণ্ডের পুনর্বিচার, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারসহ চারদলীয় জোট সরকারের সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যার বিচার করা হবে। বর্তমান সরকার জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার করবে কিনা- জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, "তার স্ত্রী (খালেদা) তো বলেছেনই, তারা বিচার পেয়ে গেছেন।" বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ছয় ফাঁসির আসামি বিদেশে পালিয়ে আছেন। তাদের ফেরত আনার বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আশরাফ বলেন, "পলাতক আসামিরা যেখানেই থাকুক না কেন, যত সময়ই লাগুক না কেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আগ্রগতি হচ্ছে।" "বিশ্ব রাজনীতির যে পরিস্থিতি তাতে এ আসামিদের চিহ্নিত করে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো সহজ হবে। কারণ, এ বিচার ছিলো, স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক। এই বিচারে বিশ্ববাসী সন্তুষ্ট", বলেন তিনি। রায় কত দিনের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে- জানতে চাওয়া হলে আশরাফ সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, "আমরা ৩৪ বছর অপেক্ষা করেছি। আরো ৩৪ বছর অপেক্ষা করতে রাজি আছি। তবুও ন্যায়বিচার চাই।" দলীয় নেতা-কর্মীদের ধৈর্য ধরে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, "এটা (রায়) কোনো উল্লাসের বিষয় নয়। কেননা, আমরা তো আর বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পাবো না। "আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সর্বোত্তম প্রতিশোধ হবে জাতির জনকের আদর্শ প্রতিষ্ঠা এবং তার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্য-শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।" সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মতিয়া চৌধুরী, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, মাহবুব-উল-হক হানিফ, আব্দুল মান্নান খান, আসাদুজ্জামান নূর, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন, আখতারুজ্জামান, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আহম্মদ হোসেন, মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ। ছাত্রলীগের মিলাদ বঙ্গবন্ধু মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে ছাত্রলীগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকও এতে যোগ দেন। ছাত্রলীগ সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এই রায়ের মাধ্যমে বাঙালি জাতি পাপমুক্ত হলো। তাই পুরো জাতির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আমরাও তা স্বাগত জানাই।" ছাত্রলীগের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী মিলাদে অংশ নেয়।

Justice order of the day

Justice order of the day
SC delivers Bangabandhu verdict at 11:00am today as nation waits to see culprits behind the horrendous crime get punished A MOMENT NEVER TO COME BACK: This snapshot captures an affectionate father -Bangabandhu -- with daughter Sheikh Hasina. Star File PhotoSyed Badrul Ahsan The nation waits to hear the ultimate verdict today in the Bangabandhu murder case trial with bated breath and also in the expectation that finally justice will prevail. It has been a long, painful journey for the people of Bangladesh. It ought not to have been this way, for the particular reason that the liberation of Bangladesh from Pakistani occupation in December 1971 was considered symbolic of a clean break with the past. That Bangalees would see democracy grow in their country, that under the leadership of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman they would go forth to create Shonar Bangla, a cause the Father of the Nation had consistently espoused since he emerged with his Six-Point programme of regional autonomy in the mid-1960s, was not a misplaced expectation. Indeed, it was a dream that seemed eminently attainable with Bangabandhu as the undisputed leader of this country. And yet that dream was to be marred by the conspiracies already afoot to undermine Bangabandhu and his government. These conspiracies took form and substance even as the government struggled to provide meaningful leadership to the nation. In the pre-dawn hours of 15 August 1975, the conspirators struck. As the nation slept, the killer squads fanned out across various key points in Dhaka, the pre-eminent one being the residence of the President of the Republic, Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman. In one fell stroke, the assassins put an end to the life of the Father of the Nation and to the lives of most members of his family. His wife, three sons, two daughters in law, his brother, his brother in law Abdur Rab Serniabat, his nephew Sheikh Fazlul Haq Moni and Moni's wife Arzoo were all murdered in what would be a macabre demonstration of ferocity. The assassins would not be prosecuted for a long period of twenty-one years. An infamous indemnity ordinance, put in place by the usurper president Khondokar Moshtaque Ahmed and subsequently incorporated in the nation's sacred constitution by General Ziaur Rahman, Bangladesh's first military ruler, ensured that Bangabandhu's killers (who had also murdered the four national leaders in prison in November 1975) would remain beyond the pale of the law. The killers were indeed rewarded, through being appointed to the nation's diplomatic missions abroad. After Zia's assassination in an abortive coup in May 1981, successive governments until 1996 made no effort to overturn the indemnity ordinance and bring Bangabandhu's killers to justice. During the Ershad period between 1982 and 1990, the assassins were permitted to form political parties and take part in elections. When a popular uprising forced General Ershad from power in December 1990 and democracy was restored through the general elections of February 1991, the nation looked forward to a time of healing of the old gaping wound. Regrettably, the government led by Khaleda Zia, widow of Ziaur Rahman, pursued the old policy of keeping the killers safe from prosecution. Twenty-one years after August 1975, the Awami League was voted back to power in June 1996. The government it formed moved briskly to annul the indemnity ordinance and bring Bangabandhu's killers to justice. Those among the assassins who were inside the country were arrested; the others were on the run, outside Bangladesh. That in no way obviated the requirements of justice. Parliament annulled the indemnity ordinance, clearing the way for the perpetrators of the August 1975 tragedy to be brought before the law. In what it considered to be the need for transparency and for justice to be done and to be seen to be done, the government of Sheikh Hasina initiated proceedings against the killers of 1975. In November 1998, the men accused of killing the Father of the Nation and his family were found guilty and sentenced to death. And then everything stalled with the return to power of the Bangladesh Nationalist Party in 2001. The new government of Begum Zia appeared reluctant to pursue the case. In more than one instance, judges felt embarrassed about presiding over the appeals hearings in the case. Conditions came to a pass where soon an inadequacy of judges on the bench led to a stultification of the proceedings of the case. It was a situation that would permeate the entire period of the BNP-Jamaat alliance government between 2001 and 2006. The return of the Awami League to office through its victory at the general elections of December 2008 marked the beginning of a new phase in the Bangabandhu murder trial. Over the last many months, review petitions filed by the convicts have been heard and both prosecution and defence have argued the case in detail. This morning is, in light of all the twists and turns of the last three and a half decades, or nearly, a moment of reckoning. On a bigger scale, it ought to be a new dawn where a restoration of values should come to underpin Bengali collective life once more. It should be a day where the people of Bangladesh can rise in unison and proclaim to the world that crime does not pay, that rule of law eventually is triumphant, that through a legal condemnation of murder and mayhem we as a nation are finally ready to expiate our collective sin of witnessing Bangabandhu die and staying quiet about the grievous tragedy for years on end. The judicial judgement today, we believe in the core of our beings, will give us back our self-esteem as a nation --- the dignity we caused to flower in ourselves under the inspiring leadership of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman in our armed struggle for liberty back in 1971

Justice order of the day

Hang the killers: SC Star Online Report The Supreme Court on Thursday upheld the High Court verdict that confirmed death sentences of 12 retired and dismissed army men in Bangabandhu Sheikh Mijubur Rahman assassination case. The five-member bench comprising Justice Md Tafazzul Islam, Justice Md Abdul Aziz, Justice BK Das, Justice Md Muzammel Hossain and Justice SK Sinha delivered the verdict dismissing the appeals filed by five convicts against their death sentences in this case. Lt Col (sacked) Syed Farooq-ur Rahman, Lt Col (retd) Sultan Shahriar Rashid Khan, Lt Col (retd) Muhiuddin Ahmed, Lt Col (retd) AKM Mohiuddin Ahmed and Maj (retd) Bazlul Huda, who are now behind bars, filed the appeals with the apex court in October 2007 against their convictions and death sentences by a lower court. Of the other seven condemned killers, Lt Col (retd) Md Abdul Aziz Pasha had died earlier. The death sentences of Col (retd) Khandaker Abdur Rashid, Maj (retd) Shariful Haque Dalim, Lt Col (retd) AM Rashed Chowdhury, Lt Col (retd) SHMB Noor Chowdhury, Capt (retd) Abdul Mazed and Risaldar (retd) Moslemuddin delivered by the High Court will stand valid as they are absconding at present. In his immediate reaction to the justice, chief counsel for the state Anisul Huq told The Daily Star, "The nation has got the justice." Barrister Abdullah-al Mamun, counsel for convicts Bazlul Huda and AKM Mohiuddin, said they will submit a review petition with the Supreme Court within the stipulated 30 days after receiving the SC certified copy of the judgment. The SC observed in the verdict that Justice M Fazlul Karim has properly delivered the verdict and this court cannot interfere in it. The court said Justice Fazlul Karim has reviewed the matter of six accused as earlier two judges of the HC had expressed same opinion about the nine other accused, out of 15, in this case. The apex court said that the trial court and the HC have properly explained the delay in filing the first information report (FIR) of this case. The court of judges said the incidents of August 15, 1975 were a simple murder and it was not a result of mutiny. Criminal conspiracy was committed to murder Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman and this was not committed for any mutiny, it added. The court further said there was no contradiction or anomaly in the evidence and the statements in this case. So, there is nothing to interfere in the HC verdict. And the HC verdict has been confirmed, the court said. After hearing for 29 days the appeals, the special bench delivered the verdict. Convicts Lt Col (sacked) Syed Farooq-ur Rahman, Lt Col (retd) Sultan Shahriar Rashid Khan, Lt Col (retd) Muhiuddin Ahmed, Lt Col (retd) AKM Mohiuddin Ahmed, and Maj (retd) Bazlul Huda, who are now behind bars, filed the appeals with the apex court in October 2007 against their convictions and death sentences by a lower court. Earlier on November 8, 1998, Dhaka Sessions Judge Golam Rasul handed down death sentences to 15 of the 20 defendants in the case. The court gave the capital punishment to Lt Col (dismissed) Syed Farooq-ur Rahman, Lt Col (retd) Sultan Shahriar Rashid Khan, Lt Col (retd) Muhiuddin Ahmed, Lt Col (retd) AKM Mahiuddin Ahmed, Maj (retd) Bazlul Huda, Lt Col (retd) Khandaker Abdur Rashid, Maj (retd) Shariful Haque Dalim, Maj (retd) Ahmed Shariful Hossain, Lt Col (retd) AM Rashed Chowdhury, Lt Col (retd) SHMB Noor Chowdhury, Lt Col (retd) Md Abdul Aziz Pasha, Capt (retd) Md Kismat Hashem, Capt (retd) Nazmul Hossain Ansar, Capt (retd) Abdul Mazed, and Risaldar (retd) Moslemuddin. A division bench of the High Court comprising Justice Md Ruhul Amin and Justice ABM Khairul Haque on December 14, 2000, delivered split verdicts on death reference appeals in the case. First judge Justice Md Ruhul Amin upheld the death sentences of 10 and acquitted five -- Muhiuddin Ahmed, Ahmed Shariful Hossain, Md Kismat Hashem, Nazmul Hossain Ansar, and Moslemuddin. Second judge Justice ABM Khairul Haque upheld the death sentences of all 15 convicts. On January 15, 2001, Justice Mohammad Fazlul Karim was appointed as the third judge to adjudicate the appeals. He delivered the final High Court verdict in the case on April 30, 2001, affirming the convictions and death sentences of 12 of the 15 defendants. The three that he acquitted are Md Kismat Hashem, Ahmed Shariful Hossain, and Nazmul Hossain Ansar. The deafening sound of gunshots broke the stillness of dawn on August 15, 1975 on road No 32 of Dhanmondi residential area. In less than an hour, the darkest chapter in the political history of Bangladesh was written on that fateful morning. Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman and the following members of his family were assassinated in three separate attacks: his wife Begum Fazilatunnessa, sons Sheikh Kamal, Sheikh Jamal and nine-year-old Sheikh Russel, daughters-in-law Sultana Kamal, Parveen Jamal, Bangabandhu's brother Sheikh Naser, brother-in-law Abdur Rab Serniabat, 13-year-old Baby Serniabat, Serniabat's son Arif, four-year-old grand son Babu, a visiting nephew, three guests, four servants, Sheikh Fazlul Huq Moni, a nephew of Bangabandhu, his wife Begum Arju Moni, and Bangabandhu's security chief Colonel Jamil Uddin Ahmed.

ভোর রাতে মুহুর্মুহু গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়

প্রদীপ চৌধুরী ঢাকা, নভেম্বর ১৮ )-" ওইদিন ভোর রাতে মুহুর্মুহু গুলির শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। আমার শ্বাশুড়ি (আমেনা সেরনিয়াবাত) শ্বশুরকে (আব্দুর রব সেরনিয়াবাত) বলছিলেন, 'বাসায় ডাকাত পড়েছে।' এর উত্তরে শ্বশুর বলেন, 'মন্ত্রীর বাড়িতে ডাকাত পড়ে না। মনে হয়, আর্মি আক্রমণ করেছে।" বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে এভাবেই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘটনার বর্ণনা দেন ওই রাতে বেঁচে যাওয়া শাহান-আরা-আব্দুল্লাহ। তিনি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ছেলে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর স্ত্রী। বুধবার তিনি বলেন, "এ সময় আমরা সবাই শ্বশুরের রুমে চলে যাই। বাড়ির কাজের বুয়া লক্ষ্মীর মা বিপদ বুঝতে পেরে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। এর কিছুক্ষণ পরই দরজা ভেঙে ভেতর ঢুকে পড়ে বেশ কিছু সেনা সদস্য। আমাদের সবাইকে নিচের রুমে এনে ব্রাশফায়ার করলো।" পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট খুনিরা প্রথমে আক্রমণ করে ২৭ মিন্টো রোডে, সেরনিয়াবাতের বাড়িতে। ভোররাত সোয়া ৫টার দিকে মেজর ডালিমের নেতৃত্বে ওই বাড়িতে হামলা চালানো হয়। হত্যা করা হয় আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, ১০ বছরের ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, চার বছরের নাতি সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু (আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে), ভাতিজা সাংবাদিক ও অ্যাডভোকেট শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নাইম খান রিন্টুসহ কয়েকজন। শাহান-আরা- আব্দুল্লাহ বলেন, "একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পঁচাত্তরের ১০ আগস্ট আমরা বরিশাল থেকে এসেছিলাম। ১৫ আগস্ট ভোররাতে সবাইকে এক সঙ্গে দাঁড় করিয়ে যখন ব্রাশ ফায়ার করা হলো, তখন আমার চার বছরের ছেলে বাবু ছিল শহীদ সেরনিয়াবাতের কোলে। আর আমার কোলে ছিল ১০ মাস বয়সী ছেলে সাদেক আব্দুল্লাহ ।" "চোখের সামনে দেখলাম, শহীদের শরীর গুলিতে ঝাঝরা হয়ে গেল। আমার আদরের ছেলে বাবুসহ উপুড় হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। পর মুহুর্তে গুলি লাগে আমার শরীরে। আমি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি।" শাহান-আরা- আব্দুল্লাহর ধারণা, আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ মনে করেই গুলি করা হয় শহীদ সেরনিয়াবাতকে। তিনি জানান, হামলার পর রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিহত-আহত সবাইকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কান্না বিজড়িত কন্ঠে শাহান-আরা বলেন, "আমার শরীরে চারটা গুলি লেগেছিল। হাসপাতালে ঢোকার সময় দেখি গাড়ি থেকে মণি ভাইয়ের লাশ নামানো হচ্ছে। কিছুদিন হাসপাতালে ছিলাম। সেখান থেকে কিছুদিন সোবহানবাগে খালা শ্বাশুড়ির (খাদিজা হোসেন, বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন) বাড়িতে ছিলাম। পরিস্থিতি ভালো না হওয়ায় '৭৬ সালের ১২ ফেব্র"য়ারি আমরা বরিশাল চলে যাই। কিন্তু সেখানেও নিরাপদ না হওয়ায় ভারতে চলে গিয়েছিলাম।" "আমার শাশুড়ি শরীরে গুলির অংশ নিয়ে দীর্ঘ দিন নিদারুন যন্ত্রনা ভোগ করে তিন বছর আগে মারা গেছেন। আমরা যারা বেঁচে আছি, এখনো বুকের গভীরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যতদিন না খুনিরা শাস্তি পাবে, ততদিন এই রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে না।" বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/পিসি/এসএইচ/ ০৩২৪ ঘ.

ঢাকা, নভেম্বর ১৯ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- দণ্ড কমানোর জন্য আসামি পক্ষ এমন কোনো যুক্তি আদালতে তুলে ধরতে পারেনি, তাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল

দণ্ড কমানোর জন্য আসামি পক্ষ এমন কোনো যুক্তি আদালতে তুলে ধরতে পারেনি, তাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছে। এ কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হক। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ৩৪ বছর অপেক্ষার পর জাতি বিচার পেয়েছে। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, প্রমাণিত হলো সত্যের বিচার হয়। ঐতিহাসিক এক রায়ে বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি পাঁচ আসামি বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও এ কে এম মহিউদ্দিনের আপিল নাকচ করে আপিল বিভাগ। এর ফলে ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলো জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, "সুপ্রিম কোর্টে যে আসামিরা আপিল করেছে তাদের আপিল খারিজ করে আদালত রায় দিয়েছে। যারা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি তাদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের রায়ের পর থেকেই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ কার্যকর রয়েছে।" তিনি বলেন, "পাঁচটি যুক্তিতে আসামিদের আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছিল আদালত। প্রত্যেকটি যুক্তিতে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য আদালত গ্রহণ করেছে। আর আসামিপক্ষের বক্তব্য নাকচ করেছে। "আদালত রায়ে বলেছে, আসামিরা এমন যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেনি, যাতে আসামিদের দণ্ড কমানো যায়। এ জন্য আদালত হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছে।" রায় কতদিন পর কার্যকর করা যাবে- জানতে চাওয়া হলে আনিসুল বলেন, "জেল কোডের বিধান অনুযায়ী, এ রায় যখন কারাগারে যাবে তার ২১ দিন পরে ও ২৮ দিন অতিবাহিত হওয়ার আগে কার্যকর করতে হয়।" আসামিদের আর কোনো সুযোগ রয়েছে কিনা- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "আসামিরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারবেন। এ জন্য তাদেরকে সাতদিন সময় দেওয়া হয়। তবে এ সাতদিন ২১-২৮ দিনের মধ্যে গণনা হবে।" আসামিদের রিভিউ আবেদন দায়ের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, "সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসামিদের রিভিউ আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করতে হবে।" অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, "জাতির জীবনে আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। এ রায় মানব জাতির ইতিহানে শ্রেষ্ঠ রায় হিসেবে বিবেচিত হবে। এই খুনিদের বাঁচানোর জন্য দীর্ঘ ৩৪ বছর অনেক চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আজ প্রমাণ হলো সত্যের বিচার হয়।" তিনি বলেন, "সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার কথা হলো, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন কোনো হত্যার বিষয়ে চুপ করে থাকে তার চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু থাকতে পারে না।" ফাঁসির আসামিদের মধ্যে আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, মোসলেমউদ্দিন, রাশেদ চৌধুরী ও আব্দুল মাজেদ বিদেশে পালিয়ে আছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে ইন্টারপোলের পরোয়ানা রয়েছে। পলাতক খুনিদের দেশে ফেরত আনায় সহায়তা করতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/প্রতিনিধি/এফএফ/এমআই/১৬৩০ ঘ.

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঘাতকের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারান তার সহধর্মিনী ও রাজনীতির নেপথ্য প্রেরণাদাতা শেখ ফজিলাতুন্ন

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঘাতকের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারান তার সহধর্মিনী ও রাজনীতির নেপথ্য প্রেরণাদাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। মাকে নিয়ে লিখেছেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা... .... মাত্র তিন বছর বয়সে পিতার মৃত্যু হয়। পিতার নাম শেখ জহুরুল হক, মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। দাদা শেখ কাশেম চাচাতো ভাই শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানের (বয়স ১১) সঙ্গে ফজিলাতুননেছার বিবাহ দেন। তার সমস্ত সম্পত্তি দুই বোনের নামে লিখে দেন। বড় বোন জিন্নাতুননেছার বয়স ৭ বছর এবং ফজিলাতুননেছার বয়স ৫ বছরের সময় মায়ের মৃত্যু হয়। তখন থেকে বেগম ফজিলাতুননেছাকে শাশুড়ি কোলে তুলে নেন এবং নিজের সন্তানদের সঙ্গে লালন-পালন করেন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে প্রাথমিক লেখাপড়া করেন। তখনকার সামাজিক রীতি অনুযায়ী বয়স দশ বছর হলে স্কুলে পাঠানো সামাজিকভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হত। পড়াশোনার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ থাকার কারণে গ্রামে গৃহশিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করেন। টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ বাড়িতে পরিবারের ছেলে-মেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষা দানের জন্য মৌলভী এবং বাংলা, ইংরেজি ও অঙ্ক শিক্ষার জন্য গৃহশিক্ষক রাখার রেওয়াজ ছিল। পরিবারের সকল শিশু-কিশোর বিশেষ করে মেয়েরা বাড়িতেই শিক্ষা গ্রহণ করত। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি তাঁর অত্যন্ত আগ্রহ ছিল। পরবর্তী জীবনে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছিলেন। স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। মনেপ্রাণে একজন আদর্শ বাঙালী নারী ছিলেন। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী শান্ত, অসীম ধৈর্য ও সাহস নিয়ে জীবনে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেন। জীবনে কোন চাহিদা ছিল না, কোন মোহ ছিল না। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করেছেন। এমন কি ছাত্র রাজনীতি করতে গিয়ে যখনই অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতো তখনও পিতৃ সম্পত্তির থেকে বিনা দ্বিধায় প্রেরণ করতেন। তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। গরীব আত্মীয়-স্বজনদের যে কোন অর্থনৈতিক সংকটে মুক্ত হস্তে দান করেছেন। সংগঠনের নেতা কর্মীদের রোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কন্যাদায়গ্রস্থ পিতাকে অর্থসাহায্য করা, ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য সাহায্য সব সময়ই করতেন। বঙ্গবন্ধু ব্যস্ত থাকতেন রাজনীতি নিয়ে, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা, পরিবার-পরিজনদের খোঁজ খবর রাখা, সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান করা ইত্যাদি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি করতেন। আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় কর্মীদের সুখ-দুঃখের সাথী ছিলেন তিনি। তাঁর কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে কেউ কখনও রিক্ত হাতে ফিরে যেত না। অনাথ এতিমদের তিনি সব সময় সাহায্য করতেন। রাজনৈতিক জীবনে অনেক জটিল পরিস্থিতিতে স্বামীর পাশে থেকে সৎ পরামর্শ দিতেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করতেন। বঙ্গবন্ধু তার সঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতেন। যেহেতু স্বামী ব্যস্ত থাকতেন কাজেই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সব দায়িত্বই তিনি নিজের হাতে নিয়েছিলেন। স্বামীর আদর্শে অনুুপ্রাণিত হয়ে তিনি সন্তানদের গড়ে তোলেন। মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করার পর গোয়েন্দা সংস্থা বেগম মুজিবকে কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদ (ইন্টারোগেশন) করে গ্রেপ্তারের হুমকি দেয়। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রতি পদক্ষেপে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন। ছায়ার মত অনুসরণ করেছেন স্বামীর আদর্শকে বাস্তবায়ন করবার জন্য। জীবনে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন। অনেক কষ্ট দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু জীবনের সব থেকে সুন্দর সময়গুলো কারান্তরালে কাটিয়েছেন বছরের পর বছর। তাঁর অবর্তমানে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা, দলকে সংগঠিত করা, আন্দোলন পরিচালনা করা, প্রতিটি কাজে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের বলিষ্ঠ সংগঠক ছিলেন নেপথ্যে থেকে। তাঁর স্মরণশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল, আন্দোলন চলাকালের প্রতিটি ঘটনা জেলখানায় সাক্ষাতকারের সময় বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশ নিয়ে আসতেন, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে সে নির্দেশ জানাতেন। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার চোখ বাঁচিয়ে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন। আবার আওয়ামী লীগের কার্যকরি সংসদের সভা ধানমণ্ডি ৩২ নং সড়কের বাড়িতে চলাকালে নিজের হাতে রান্না-বান্না করতেন এবং তাদের খাদ্য পরিবেশন করতেন। এই সংগঠনের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান সংগঠিত করবার কাজে তাঁর অবদান অপরিসীম। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার চক্ষু বাঁচিয়ে সংগঠনকে সংগঠিত করতেন, ছাত্রদের নির্দেশ দিতেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতেন। ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চ, রাত একটার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। ধানমণ্ডির ৩২ নং সড়কের বাড়ি আক্রমণ করে প্রচণ্ড গুলি-গোলা চালায় এবং পর দিন অর্থাৎ ২৬ তারিখ সন্ধ্যায় আবার বাড়ি আক্রমণ করে, শেখ জামাল, রাসেলকে নিয়ে বেগম মুজিব ওই বাড়িতে ছিলেন। হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শেখ কামাল ২৫ শে মার্চ রাত্রে ছাত্রদের সঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চলে যায়। পিতার গ্রেপ্তার হবার সংবাদ পেয়ে কামাল কার্ফুর ভিতরেই গেরিলা কায়দায় ৫০টি বাড়ির দেয়াল টপকে সন্ধ্যায় মাকে দেখতে আসে। বাড়ি আক্রমণ হবার সঙ্গে সঙ্গে দেয়াল টপকে সন্তানদের নিয়ে বেগম মুজিব পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। হানাদার বাহিনী তাঁকে খুঁজতে থাকে। দিনের পর দিন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় লুকিয়ে লুকিয়ে দিন কাটান। অবশেষে একদিন হানাদার বাহিনী তাঁকে মগবাজারের একটা বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে ধানমণ্ডির ১৮ নং রোডের একটা বাড়িতে এনে বন্দি করে রাখে। বন্দি অবস্থায় ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনেক মানসিক যন্ত্রণা ও অত্যাচার ভোগ করেন। ১৭ই ডিসেম্বর মুক্তিলাভ করেন। মুক্তিলাভের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির উপরে হানাদার বাহিনী কর্তৃক টাঙ্গিয়ে রাখা পাকিস্তানী পতাকা ছিড়ে টুকরো টুকরো করেন, পা দিয়ে মাড়ান ও আগুন লাগিয়ে দেন। নিজেই জয়বাংলা শ্লোগান দিতে শুরু করেন। এ সময় হাজার হাজার মানুষ বাড়িতে ছুটে আসতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে জামাল ফিরে আসে, পরে কামাল আসে। তখনও বঙ্গবন্ধুর কোন খবর জানা যায়নি। এক বুক ব্যথা নিয়ে, আশঙ্কা ভরা মন নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। তখনও তিনি জানেন না-স্বামী জীবিত আছেন কিনা, ফিরে আসবেন কি না? সে সময়টা ছিল তাঁর জীবনে সব থেকে কঠিন সময়। অবশেষে ৮ই জানুয়ারি বিবিসি রেডিওর মাধ্যমে প্রথম জানা গেল যে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়েছেন। বাসায় জরুরি ভিত্তিতে টেলিফোন লাগানো হল। প্রথম ফোনে গলার আওয়াজ শুনলেন। তার পর থেকে স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসা পর্যন্ত হাতে তসবিহ ও জায়নামাজেই সময় কাটালেন। ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন। প্রথমেই গেলেন তাঁর প্রিয় জনতার মাঝে, পরে এলেন পরিবার পরিজনের কাছে। বেগম মুজিব আশ্রয় পেলেন স্বামীর বিশাল বুকে। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। তাঁর পাশে থেকে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি সংসার গড়ে তুলতে আত্মনিয়োগ করলেন বেগম মুজিব, পাশাপাশি বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজেও স্বামীকে সহযোগিতা করতে সচেষ্ট হলেন। বিশেষ করে লাঞ্ছিতা মা-বোনকে সহযোগিতা করা, তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা, ব্যক্তিগতভাবে তাদের পাশে গিয়ে সাত্ত্বনা দেওয়া ও সামাজিকভাবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেন। ধীরে ধীরে অনেক বীরাঙ্গনাকে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে মর্যাদা সম্পন্ন জীবন দান করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সর্বদা স্বামীর পাশে থেকে দেশ ও জাতির সেবা করে যান। দেশ ও দেশবাসীর জন্য সমগ্রজীবন তিনি আত্মত্যাগ করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনককে নির্মমভাবে খুনিরা হত্যা করে। হত্যার পর বেগম মুজিবকেও হত্যা করে। ঘাতকের বুলেটের আঘাতে তার শরীর ঝাঝরা হয়ে যায়, তিনি লুটিয়ে পড়েন শোবার ঘরের দরজার সামনে। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড ঘটে। বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী মরণকালেও সঙ্গী হয়ে রইলেন। সারাটা জীবন তিনি শুধু ত্যাগই করে গেছেন। প্রয়োজনে নিজের গহনা বিক্রি করে স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তারই আত্মত্যাগের মহিমায় বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে রয়েছে অবদান। মৃত্যুর কোলে ঘাতকের আঘাতে তিনি ঢলে পড়লেন। একজন মুসলিম নারী হিসেবে যা তার প্রাপ্য তাও তো তিনি পাননি। কাফন-দাফনটুকুও তাঁদের দেওয়া হল না। রক্তাক্ত পরনের কাপড় নিয়ে শহীদী মৃত্যুবরণ করলেন। স্বামী, পুত্র, পুত্রবধুদের সঙ্গে একই সাথে চলে গেলেন। নীরবে তিনি করে গেলেন কত বড় আত্মত্যাগ বাংলার মানুষ কি তাঁর কথা মনে রাখবে? ফেলবে কি দু'ফোটা অশ্র" এই মহতী নারীর জন্য। কবি নজরুলের কবিতায় "রাজা করিছে রাজ্য শাসন বাজারে শাসিছে রাণী, রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে, রাজ্যের যত গ্লানি"। তিনি অনুপ্রেরণা, শক্তি, সাহস, মনোবল প্রেরণা যুগিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন স্বামীকে। তাই তো বাংলার মানুষ পেয়েছে আজ স্বাধীন বাংলাদেশ। পেয়েছে আত্মপরিচয়ের সুযোগ। বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেয়েছে একটি দেশ। আত্ম-পরিচয়ের সুযোগ পেয়েছে একটি জাতি। দিনের পর দিন চলে যায়, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ঘুরে যায়, যুগের পর যুগ �কিন্তু জাতি হিসেবে আত্ম পরিচয়ের জন্য, স্বাধীনতার জন্য কত রক্ত ঝরেছে, কত অশ্র" বিসর্জন হয়েছে। নীরবে কত আত্মত্যাগের কাহিনী ঘটে গেছে। কে কতটুকু সে খবর রাখে? আজ বাংলার মানুষ যে স্বাধীনতা পেয়েছে তার জন্য কত মানুষের কত অবদান সব কি জানা গেছে? না যায়নি। কত অব্যক্ত কথা রয়ে গেছে। যে ঘটনা ঘটেছে, যে কাহিনী পর্দার আড়ালে রয়েছে তার কতটুকু আর লিখে প্রকাশ করা যায়। লেখার মধ্য দিয়ে কতটুকুই বা বোঝা যায়? এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের কাছে একটি আকুল আবেদন রইল� তারা যেন একবার খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে এই না বলা ইতিহাস, না জানা কথা।

১৫ আগস্ট আরও নিহত হন যারা

১৫ আগস্ট আরও নিহত হন যারা Thu, Nov 19th, 2009 6:42 am BdST Dial 2324 from your mobile for latest news ঢাকা, নভেম্বর ১৯ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)-- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ৩৪ বছর পর বৃহস্পতিবার এ হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে। ওই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও বেগম ফজিলতুন্নেছা মুজিব ছাড়াও তাদের পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনসহ নিহত হন আরও ২৬ জন। এদের মধ্যে যারা রয়েছেন: শেখ কামাল বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে জন্ম: টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ, ৫ই আগস্ট, ১৯৪৯ সাল। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ঢাকার শাহীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বি. এ. (অনার্স) পাস করেন। ছায়ানটে সেতার বাদন বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। নাটক, মঞ্চ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একনিষ্ঠ সংগঠক ছিলেন। ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। অভিনেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে ছিলেন প্রতিষ্ঠিত। শৈশব থেকেই খেলাধুলায় ছিলো তার প্রচণ্ড উৎসাহ। আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। বিশেষ করে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার মানোন্নয়নে তার শ্রম ও অবদান ছিল অপরিসীম। নতুন খেলোয়াড় তৈরির জন্য যথেষ্ট সময় দিয়ে নিজেই মাঠে অনুশীলন করতেন। ১৯৭৫ সালের ১৮ জুলাই সুলতানা খুকুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ছাত্রলীগের একজন সংগঠক হিসেবে '৬৬-এর স্বাধিকার আন্দোলন, '৬৯-এর গণআন্দোলন ও '৭১- এর অসহযোগ আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাতেই বাড়ি থেকে চলে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। লেফটেন্যান্ট হিসেবে কর্নেল ওসমানীর এডিসি ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হওয়ার সময় তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এম.এ. শেষ পর্বের পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ওই দিন ভোরে বাড়ি ঘেরাওয়ের কথা শুনে নিচে নেমে এলে ঘাতকরা সবার আগে তাকে গুলি করে হত্যা করে। শেখ জামাল বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় ছেলে জন্ম: টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ, ২৮ এপ্রিল, ১৯৫৪ সাল। বঙ্গবন্ধুর মেজো ছেলে শেখ জামাল শৈশবে শাহীন স্কুল ও পরে রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন। একটি সঙ্গীত শিক্ষাকেন্দ্রে গিটার বাজানো শিখতেন। ক্রিকেট খেলতেন আবাহনী মাঠে। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধানমণ্ডি ১৮ নং রোডের বাড়িতে মায়ের সঙ্গে বন্দি অবস্থায় থাকাকালে একদিন গোপনে বের হয়ে কালীগঞ্জ হয়ে মুক্তাঞ্চলে চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে থাকাকালে যুগোশ্লভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল জোসেফ টিটোর আমন্ত্রণে সেদেশে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ নিতে যান। তার পর লন্ডনের স্যান্ডহার্স্ট আর্মি একাডেমি থেকে সেনা প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে তিনি দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট র‌্যাংকে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের ১৭ই জুলাই ফুফাতো বোন রোজীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ১৫ আগস্ট তাদের এক সঙ্গে গুলি করে হত্যা করা হয়। শেখ রাসেল বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র জন্ম: ঢাকা, ১৮ অক্টোবর ১৯৬৪ সাল। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। বাড়ির ছোট্ট ছেলে হিসেবে সবার আদরের ছিল। রাজনৈতিক পরিবেশ ও সঙ্কটের মধ্যেও সে চির সঙ্গী সাইকেল নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখতো। ১৯৭১�এর মুক্তিযুদ্ধকালীন দীর্ঘ নয়মাস পিতার অদর্শন তাকে এমনই ভাবপ্রবণ করে রাখে যে, পরে সব সময় পিতার কাছাকাছি থাকতে জেদ করতো। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবাইকে হত্যা করে তাদের লাশ দেখিয়ে তারপর রাসেলকে হত্যা করা হয়। তাকে কাজের লোকজন পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নিয়ে যায়। কিন্তু ঘাতকরা তাকে দেখে ফেলে। বুলেটবিদ্ধ করার পূর্বে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে অনুমতি নেওয়া হয়। রাসেল প্রথমে মায়ের কাছে যেতে চায়। মায়ের লাশ দেখার পর অশ্র"সিক্ত কণ্ঠে মিনতি করেছিল 'আমাকে হাসু আপার ( শেখ হাসিনা) কাছে পাঠিয়ে দিন।' শেখ আবু নাসের বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই জন্ম: টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ, সেপ্টেম্বর, ১৯২৮ সাল। শেখ আবু নাসের টুঙ্গিপাড়া ও গোপালগঞ্জে লেখাপড়া করেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে এবং বড়ভাই রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অল্প বয়সেই তাকে পিতার সঙ্গে পারিবারিক কাজকর্ম ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়তে হয়। এজন্য খুলনা শহরে বসবাস করতে হত। পরবর্তী সময়ে তিনি খুলনায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। ১৯৭৫-এ নিহত হওয়ার সময় বড় ভাইয়ের বাড়িতে ছিলেন। তিনি অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে রেখে যান। সুলতানা কামাল খুকু শেখ কামালের স্ত্রী জন্ম: ঢাকা, ১৯৫১ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী দবির উদ্দিন আহমেদের ছোট মেয়ে। মুসলিম গার্লস স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স পাস করেন। ১৯৭৫ সালে এম. এ পরীক্ষা দেন। স্কুল থেকে আন্তঃখেলাধুলায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন বিভাগে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। বিশেষ করে লংজাম্পে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক ক্রীড়ায় চ্যাম্পিয়ন হন। মোহামেডান ক্লাবের পক্ষে ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান অলিম্পিকে লংজাম্পে দ্বিতীয়, ১৯৬৮ সালে ঢাকার মাঠে পাকিস্তান অলিম্পিকে লং জাম্পে ১৬ ফুট দূরত্ব অতিক্রমের রেকর্ডসহ স্বর্ণপদক পান। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯-৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করে জাতীয় ক্রীড়ায় অংশ নিয়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। ১৯৭০ সালে নিখিল পাকিস্তান মহিলা এথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় তিনি রেকর্ডসহ স্বর্ণ পদক পান। ১৯৭৩-এ লংজাম্পে স্বর্ণ পান। ১৯৭৪ এ লংজাম্প ছাড়াও সুলতানা ১০০ মিটার হার্ডলসে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বিয়ের আগে তাকে দেখে আশীর্বাদ করেছিলেন। বাড়ির বড় বউ হিসাবে তার বিপুল সমাদর হয়েছিল। পারভীন জামাল রোজী শেখ জামালের স্ত্রী জন্ম: সিলেট, ১৯৫৬ সাল। বঙ্গবন্ধুর ছোট্ট বোন খাদেজা হোসেনের মেয়ে। পিতা সৈয়দ হোসেন বঙ্গবন্ধু সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। ধানমণ্ডি গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে বদরুন্নেসা আহমেদ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। মাত্র ৩০ দিনের বিবাহিত জীবন ছিল তার। মেহেদির রং তখনও তার দু'হাতে ছিল। বেগম মুজিবকে হত্যা করে ঘাতকরা জামালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোজী ও সুলতানাকে এক সঙ্গে গুলি ছুঁড়ে হত্যা করে। ওই বাড়িতে দু'বধুর শুভাগমন যেমন এক সঙ্গে তেমনি শোকাহত বিদায়ও ছিলো একসঙ্গে। আবদুর রব সেরনিয়াবাত বঙ্গবন্ধুর সেজ বোনের স্বামী জন্ম: বরিশাল, ১৪ই চৈত্র ১৩২৭ বাংলা। বরিশাল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী ছিলেন। বেকার হোস্টেলেও এক সঙ্গে থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর সেজ বোন আমেনা বেগমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কলকাতায় আই. এ. ও বি. এ পাস করার পরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করে বরিশালে আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১- এর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭২ সালের ১২ই এপ্রিল কৃষিমন্ত্রী হন। ১৯৭৩ এর নির্বাচনেও জয়লাভ করেন এবং বঙ্গবন্ধু তাকে সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী নিয়োগ করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের কৃষিক্ষেত্রে সংস্কার ও উৎপাদনে এবং কৃষকদের সহায়তা দেওয়ায় তার ভূমিকা ছিল যথেষ্ট জোরালো। একজন সৎ আদর্শবান ব্যক্তি হিসেবে তিনি সব মহলে প্রশংসিত ছিলেন। শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর মেজো বোনের বড় ছেলে জন্ম: টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ ৪ঠা ডিসেম্বর, ১৯৩৯ সাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একনিষ্ঠ অনুসারী, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সাংবাদিক, দৈনিক বাংলার বাণী ও বাংলাদেশ টাইমস-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, সাপ্তাহিক 'সিনেমা' ও মধুমতি মুদ্রণালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণি ১৯৫৬ সালে ঢাকা নবকুমার স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৫৮ সালে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ থেকে আই.এ. ১৯৬০ সালে বরিশাল বি. এম. কলেজ থেকে বি. এ. এবং ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম. এ. বং পরবর্তী সময়ে এলএলবি পাস করেন। ছাত্রাবস্থায়ই শেখ মনি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬০ সালে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে কুখ্যাত হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছয় মাস বিনা বিচারে আটক থাকার পর তিনি মুক্তি পান। গণবিরোধী শিক্ষানীতি ও সরকারের দমনীতির প্রতিবাদে ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে তদানীন্তন গভর্নর মোনায়েম খানের হাত থেকে ডিগ্রি সার্টিফিকেট না নিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য শেখ মনির এম. এ. ডিগ্রী কেড়ে নেওয়া হয়। কিছু দিন পর তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৫ সালের শেষাশেষি পর্যন্ত তাকে দেশরক্ষা আইনে আটক রাখা হয়। এ সময় সরকার তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সাজানো মামলা দায়ের করে। ১৯৬৬ সালে শেখ ফজলুল হক মণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত বাঙালির স্বাধিকারের সনদ ঐতিহাসিক ছয়দফার পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছয় দফা আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণীকে সংগঠিত করা এবং ঐতিহাসিক ৭ জুনের হরতাল সর্বাত্মক সফল করার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। ওই সময় সরকার শেখ মনির বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে। ১৯৬৬ সালের জুলাই মাসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর মুক্তিযোদ্ধা ও যুব সমাজকে সংগঠিত করে দেশগড়ার কাজে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে শেখ মনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তেজগাঁও আঞ্চলিক শ্রমিক লীগের সভাপতি হিসেবে মনি শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করলে শেখ মনি অন্যতম সম্পাদক নিযুক্ত হন। শেখ ফজলুল হক মনি ১৯৭৩ সালে বার্লিন যুব উৎসবে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। তিনি বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন সফল সংগঠক, সুবক্তা ও সুলেখক। সম্পাদকীয় ছাড়াও তিনি স্বনামে ও ছদ্মনামে বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। ছয় দফার ওপর ও তার লেখা ছোটগল্পের সংকলন 'বৃত্ত' প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। ১৯৭৪ সালে শেখ মনির দ্বিতীয় গল্প সংকলন 'গীতা রায়' প্রকাশিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালো রাতে শেখ ফজলুল হক মনি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মনি ঘাতকের হাতে নিহত হন। সেই রাতে শেখ মনির জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ ফজলে শামস পরশ ও কনিষ্ঠপুত্র শেখ ফজলে নূর তাপস অলৌকিকভাবে রক্ষা পায়। পরশের বয়স ছিল পাঁচ বছর এবং তাপসের মাত্র তিন বছর। বেগম আরজু মনি শেখ ফজলুল হক মনির স্ত্রী জন্ম: বরিশাল, ১৫ মার্চ ১৯৪৭ সাল। বরিশাল সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও বি. এ. পাস করেন। আবদুর রব সেরনিয়াবাতের জ্যেষ্ঠ কন্যা ছিলেন। ১৯৭০ সালে খালাত ভাই শেখ ফজলুল হক মনির সঙ্গে বিয়ে হয়। দু'সন্তানের মা আরজুকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় স্বামীর সঙ্গে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। ১৯৭৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কর্ণেল জামিল উদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার জন্মঃ গোপালগঞ্জ, ১ ফেব্র"য়ারি ১৯৩৩ সাল। ১৯৫২ সালে ক্যাডেট হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৫৫ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সচিবালয়ে যোগ দেন এবং বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে ভোর ৫টায় বঙ্গবন্ধু লাল টেলিফোনে তাকে সেনাবাহিনীর বাসভবন ঘেরাওয়ের কথা জানালে সঙ্গে সঙ্গে রওনা হন তিনি। কিন্তু সোবহানবাগ মসজিদের সামনে ঘাতকরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষার জন্য তিনি আত্মাহুতি দিয়েছেন। তার এ আত্মদান জাতি চিরকাল স্মরণ করবে। বেবী সেরনিয়াবাত আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ছোট মেয়ে জন্মঃ বরিশাল, ২০ মে ১৯৬০ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরী হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। নিহত হবার সময় পিতার কাছে ছিল। আরিফ সেরনিয়াবাত আবদুর রব সেরনিয়াবাতের কনিষ্ঠ পুত্র জন্মঃ ২৭ মাচর্, ১৯৬৪ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরী উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। নিহত হওয়ার সময় ঢাকায় পিতার কাছে ছিল। সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু আবদুর রব সেরনিয়াবাতের নাতি জন্ম: গৌরনদী, বরিশাল, ২২ জুন ১৯৭১ সাল। আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ছেলে আবুল হাসনাত আবদুল্ল�াহর জ্যেষ্ঠ পুত্র বাবু নিহত হওয়ার সময় বয়স ছিল ৪ বছর এবং ঢাকায় দাদার বাসায় বেড়াতে এসেছিল। শহীদ সেরনিয়াবাত আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ভাইয়ের ছেলে জন্মঃ বরিশাল, ২৬ মার্চ ১৯৪০ সাল। বরিশাল বি এম স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, কলেজ থেকে আই. এ. ও বি. এ. পাস করেন। ঢাকা থেকে আইন পাস করে বরিশালে কোর্টে আইনজীবী ছিলেন। তিনি দৈনিক বাংলা পত্রিকার বরিশালের সংবাদদাতা ছিলেন। ১৫ আগস্ট চাচার বাসায় অবস্থানকালে নিহত হন। আবদুল নঈম খান রিন্টু আওয়ামী লীগ নেতা আমীর হোসেন আমুর খালাতো ভাই জন্মঃ বরিশাল, ১ ডিসেম্বর ১৯৫৭ সাল। বরিশাল জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেন। বরিশালের একটি সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন এবং তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় অবস্থান কালে নিহত হন।

ইতিহাসের নৃশংসতম নারী ও শিশুহত্যা কী অপরাধ ছিল তাদের!

ইতিহাসের নৃশংসতম নারী ও শিশুহত্যা কী অপরাধ ছিল তাদের! নঈম নিজাম বাবার মৃত্যুবার্ষিকী পালনে আবদুর রব সেরনিয়াবতের থাকার কথা ছিল বরিশালে। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি সফর স্থগিত করে থেকে যান ঢাকায়। নিয়তি তাকে ঢাকাতেই রেখে দেয়। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাছেরের থাকার কথা খুলনায়। নিয়তি তাকেও ঢাকায় রাখে। বড় ভাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জীবন বিসর্জন দেন শেখ নাছের। রাজনীতির নিষ্ঠুর অধ্যায়ের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক ছিল না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুধু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হননি। ঘাতকের হাত থেকে রেহাই পাননি নারী ও শিশুরা। নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, সুলতানা কামাল, পারভীন জামাল রোজি, বেগম আরজু মনি ও বেবী সেরনিয়াবতকে। উচ্ছল শিশু শেখ রাসেল, বাবু ও আরিফকেও বাঁচতে দেয়নি খুনিরা। মৃত্যুর আগে এই শিশুরা জানতে পারেনি তাদের অপরাধের কথা। ১৫ আগস্টের কয়েকদিন আগে তিন দিনের ব্যবধানে বিয়ে হয় শেখ কামাল ও শেখ জামালের। সুলতানা কামাল ও রোজি জামালের হাতের মেহেদির রঙ শুকায়নি। এই বাড়িতে তারা নতুন এসেছেন। মৃত্যুর আগে জেনেও যেতে পারেননি তাদের কী অপরাধ ছিল? রোজি এবং সুলতানার কোলে আশ্রয় নিয়েও রেহাই পায়নি রাসেল। মৃত্যুর আগে শিশু রাসেল দেখে যান এই পৃথিবীর বর্বরতা। বেগম মুজিব বারবার আকুতি জানিয়েছিলেন শিশু রাসেলকে হত্যা না করার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেপথ্যের অনুপ্রেরণা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের সেই আহ্বানে কারো মন গলেনি। যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনির স্ত্রী আরজু মনি ছিলেন অনতঃসত্ত্বা। বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় তার গর্ভের সনতানকে। এই পৃথিবীর আলোর মুখ দেখার আগেই একটি শিশু খুনিদের নৃশংসতার শিকার হন। অপর দুই শিশু তাপস, পরশ দেখেন এই নিষ্ঠুর চিত্র। বরিশাল থেকে ঢাকায় এসে আবদুর রব সেরনিয়াবতের বাড়িতে রাতে ছিলেন ৭ জন তরুণ। তাদেরই একজন রিন্টু ছিলেন প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমুর খালাতো ভাই। খুনিরা রিন্টুসহ পাঁচজনকে হত্যা করে। আবদুর রব সেরনিয়াবতের বাড়িতে থাকাটাই ছিল তাদের অপরাধ। আক্রমণের পর টেলিফোন পেয়ে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন একজন সেনাকর্মকর্তা নাম কর্নেল জামিল। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব। কর্নেল জামিল ব্যক্তিগত লাল প্রাইভেট কার নিয়ে উড়ে আসেন। সৈন্যরা তাকে বাধা দেয়। তিনি হইচই করেন এবং সৈন্যদের গালাগাল করে ৩২ নম্বরের দিকে অগ্রসর হন। সৈন্যরা বলল, আমরা গুলি করব। তিনি বলেন, গুলি করো। জীবন দেন কর্নেল জামিল। ১৫ আগস্ট শুধু জাতির জনককে হত্যা করেনি খুনিরা। শিশু, নারী ও নিরপরাধ মানুষ হত্যার দায়ে এই খুনিরা অভিযুক্ত। বাংলাদেশের মানুষ আইনের শাসন দেখতে চায়। বিচার চায় অপরাধীদের। অবসান চায় একটি নিষ্ঠুর, বর্বর অধ্যায়ের। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়েই স্বাভাবিক হতে পারে সবকিছু। জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ।

Wednesday, November 18, 2009

'একদিন গুলি একটা আমার বুকে লাগবে আর একটা বঙ্গবন্ধুর'

'একদিন গুলি একটা আমার বুকে লাগবে আর একটা বঙ্গবন্ধুর' গোলাম মর্তুজা অন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক ঢাকা, নভেম্বর ১৮ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বঙ্গবন্ধু আক্রান্ত হয়েছেন শুনেই ত্রস্ত হয়ে প্রথমে তৎকালীন সেনাপ্রধান ও পরে রক্ষীবাহিনী প্রধানকে ফোনে জানানোর চেষ্টা করেন বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দীন আহমেদ। এরপর কারও অপেক্ষা না করেই ব্যক্তিগত গাড়িটি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। বাড়ির অল্প দূরেই সোবহানবাগ মসজিদের কাছে তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। বনানীর ভাড়া বাসায় বুধবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সেদিনের সেই ঘটনার মর্মস্পর্শী বিবরণ দিলেন তার স্ত্রী সাবেক সাংসদ আঞ্জুমান আরা জামিল। আঞ্জুমান আরার কাছে সেই স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে। দুঃসহ সেই দিনের ক্ষতগুলো এখনো সমান তাজা। কথা বলতে বলতে তাই কখনও কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন আবার কখনও হচ্ছিলেন উত্তেজিত। তখন (পঁচাত্তরে ) জামিলউদ্দীনের চার মেয়ের মধ্যে বড়জনের বয়স ছিলো ১৫ বছর আর একদম ছোটটি তখনও পৃথিবীর মুখ দেখেনি। এরপর চার মেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধ শুরু হয় আঞ্জুমান আরার। তার অভিযোগ, তখনকার সরকারগুলো সাহায্য তো করেইনি, উল্টো পেছনে লাগিয়ে রেখেছিল 'টিকটিকি'। গণভবনেই স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে থাকতেন কর্নেল জামিলউদ্দীন। ১৫ আগস্ট তাকে হত্যার পরই স্ত্রী-সন্তানদের এক কাপড়েই গণভবন ছেড়ে যেতে হয়। তারা ওঠেন জামিলের বড়ভাইয়ের লালমাটিয়ার বাসায়। বঙ্গবন্ধুকে কখনও 'ফাদার', কখনও 'বঙ্গবন্ধু' সম্বোধন করতেন কর্নেল জামিল। "তিনি যে কেন গণভবনে থাকেন না!" এভাবে মাঝে-মধ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করতেন জামিল। জবাবে দরাজ গলায় আশ্বস্ত করতেন বঙ্গবন্ধু "তুই ভয় পাচ্ছিস কেন? বাঙালি আমাকে মারবে না।" তবুও শঙ্কিত থাকতেন জামিল। বলতেন, "আমি জানি একদিন গুলি একটা আমার বুকে লাগবে আর একটা বঙ্গবন্ধুর বুকে।" "তাইতো হলো। তার প্রিয় বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে আমাকে চার সন্তানসহ অকুল পাথারে ভাসিয়ে অকালে চলে গেলো," দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন আঞ্জুমান আরা। ওইদিনের ঘটনার বর্ণনায় আঞ্জুমান আরা বলেন, "সকালে বঙ্গবন্ধুর বাসার পথে বেরিয়ে যাওয়ার পর সোবহানবাগ মসজিদের সামনের রাস্তায় কিছু সৈনিককে কমান্ড করছিলেন তিনি। আঞ্জুমান আরা জানালেন, এক সময় মেজর হুদা (বজলুল হুদা) তাকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। আমি তার লাশ দেখেছি। পুরো ঝাঁজরা হয়ে গেছে। গাড়ির গায়েও অসংখ্য গুলির চিহ্ন ছিল।" এত দুঃখেও গর্ব করে তিনি বলেন, "একমাত্র তিনিই বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যদি না যেতেন তবে পুরো বাঙালি জাতিই পিতৃহত্যার দায়ে কলঙ্কিত হতো। অন্তত একজনতো পিতাকে বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছেন।" আগরতলা থেকে ১৫ আগস্ট... আঞ্জুমান আরা জানালেন, '৬৮-'৬৯ এ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় কর্নেল জামিলউদ্দীনের কথা প্রথম বঙ্গবন্ধুর কানে যায়। জামিলউদ্দীন তখন ঢাকায় আইএসআই'র (পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা) প্রধান ছিলেন। সেসময় দেশের প্রতি জামিলের আনুগত্য দেখেই তার প্রতি বঙ্গবন্ধুর অগাধ বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল বলে জানান আঞ্জুমান আরা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরলে নিজের সামরিক উপদেষ্টা বানিয়ে তাকে কাছে টেনে নেন বঙ্গবন্ধু। কষ্টের দিনলিপি... ১৫ আগস্টই গণভবন থেকে কর্নেল জামিলউদ্দীনের পরিবারকে বের করে দেওয়া হয়। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, পেটে অনাগত শিশু আর তিনটি শিশু সন্তানকে নিয়ে কোনও রকমে গিয়ে ভাসুরের বাড়িতে ওঠেন আঞ্জুমান আরা। সেখানে থাকেন নয়মাস। এরপর অনেক আবেদন করে সরকারের কাছ থেকে মাসিক দেড়শ' টাকায় মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডে একটি বাড়ি (পরিত্যক্ত সম্পত্তি) ভাড়া নেন তিনি। সেখানে থাকেন ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। শুরু করেন ইট-বালু আর ঠিকাদারি ব্যবসা। এরপরে সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদ সরকারের আমলে বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে খেই হারিয়ে ফেললেও ধীরে ধীরে পরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন আঞ্জুমান আরা তিনি। একসময় শুরু করেন ইণ্ডেন্টিং ব্যবসা। সেই সময়গুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে কেউ তার খোঁজ নেয়নি বলে অভিযোগ করে আঞ্জুমান আরা বলেন, "উল্টো হয়রানি করা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে। তবে পরিবার আগলে রেখেছিল বলেই এখনও টিকে রয়েছি।" শুধু পাওনাদি আর রেশন দিয়েছে সরকার। এছাড়া 'শহীদ'এর পরিবার হিসেবে কখনও কোনও সাহায্য পাননি তিনি। পরে বিভিন্নরকম হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানালেন জামিলপত�ী। "জিয়ার সময় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা আমাকে জ্বালাতন করতো। একবার সন্তানদের নিয়ে ভারতে আজমীর শরীফে যাওয়ার জন্য বিমান বন্দরে যাওয়ার পর আমাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। অনেক চেষ্টা করে পাসপোর্ট ফেরত পেলেও কলকাতা থেকে আজমীর শরীফ পুরো সময়টা আমাদের পেছনে গোয়েন্দা লেগে ছিলো।" নিরাপত্তা... কীসের? বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য সাংসদ তাপসের ওপর হামলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অনুগত জামিলউদ্দীনের পরিবার হিসেবে অনিরাপদ বোধ করছেন কী না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "কীসের নিরাপত্তা। সরকার, পুলিশ বা কেউতো আমাকে সাবধান হতে বলেনি। আমি আর ক'দিনই বা বাঁচবো।" তবুও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় হচ্ছে শুনে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তিনি। তবে, "জীবনতো কষ্ট করে পার হয়ে গেল। এখন আর রায়ে কী হবে বলেন। আমি কী বলবো।"

বঙ্গবন্ধু মামলার হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়

বঙ্গবন্ধু মামলার হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ঢাকা, নভেম্বর ১৯ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)--স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচারে হাইকোর্ট ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। খালাস দেয় তিন আসামিকে। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম এ রায় দিয়েছিলেন। হাইকোর্টের সেই চূড়ান্ত রায়ে বরখাস্ত লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর বজলুল হুদা, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল এ এম রাশেদ চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার), অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল এস এইচ বি এম নূর চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মো. আজিজ পাশা, অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), রিসালদার মোসলেমউদ্দিন ও অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদকে দেওয়া নিু আদালতের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। ক্যাপ্টেন মো. কিসমত হাসেম, অবসরপ্রাপ্ত মেজর আহমেদ শরিফুল হোসেন ও অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন নাজমুল হোসেন আনসারের ফাঁসির আদেশ বাতিল করে হাইকোর্ট। রায়ের শেষ অংশে হাইকোর্ট অভিমতে বলেছিল, ১২ সেনা কর্মকর্তার চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আত্মীকরণ করা হয়েছিল বলে সরকার পক্ষ সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছে। তারা হল, মেজর শরিফুল হক, মেজর আজিজ পাশা, মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন, মেজর বজলুল হুদা, মেজর রাশেদ চৌধুরী, মেজর নূর চৌধুরী, মেজর আহমেদ শরিফুল হোসেন, মেজর সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, ক্যাপ্টেন মাজেদ, লে. নাজমুল হোসেন আনসার, ক্যাপ্টেন কিসমত হাসেম ও অপর একজন। অভিমতে বলা হয়, এই সাক্ষ্য প্রমাণ করে না যে, দণ্ডিত আসামিরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের পুরস্কার হিসেবে তা পেয়েছিলেন। কারণ, ওই সাক্ষ্য ঘটনার প্রায় এক বছর পরের। এর মধ্যে অপর তিনটি ঘটনা ঘটে গেছে। এর একটি জেলহত্যা, অপর দু'টি ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরের ঘটনা। পারিপার্শ্বিক অবস্থায় এই সুনির্দিষ্ট 'ইনফারেন্সে' আসা যায় না যে, সেই ঘটনার সকালে, এই আসামিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। অভিমতে আরও বলা হয়, সরকার পক্ষ এই আসামিদের বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। আসামিরা সেই সন্দেহের সুবিধা পাবে, যদি না সরকার পক্ষ অপর কোন বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য দিয়ে সেই সন্দেহ দূর না করে। কিন্তু বর্তমান মামলায় সেই সন্দেহ দূর করার জন্য সরকার পক্ষ কোন বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারেনি। রায়ে বলা হয়, ফৌজদারি আইনশাস্ত্রের মূলনীতি হলো, আসামি দোষী প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে নির্দোষ ধরে নিতে হয়। অভিমতে আরও বলা হয়, সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার অপরাধ যদিও একটি বিদ্রোহ প্রকৃতির, তবু অপরাধের প্রকৃতি আবেগ দিয়ে প্রভাবিত নয়। আমরা কখনোই নিশ্চিতভাবে জানব না, দণ্ডিতরা ছাড়া আর কে বঙ্গবন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। তাই এ মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ সতর্কতার সঙ্গে বিচার বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। রায়ে বলা হয়, বর্তমান হত্যা ও ষড়যন্ত্রের এ মামলায় বেশিরভাগ সাক্ষীই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে। অভিযুক্তদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে বের করতে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। হাইকোর্ট বলেছে, লে. কর্নেল ফারুক ও লে. কর্নেল শাহরিয়ার রশিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিবেচনার বাইরে রাখা হয়েছে। কারণ, বিভক্ত রায়ে দুই বিচারপতি সেগুলো সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বলে একমত হতে পারেননি। তাই আমিও সেগুলো বিবেচনার বাইরে রাখছি। লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদের (আর্টিলারি) অপর একমাত্র স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রমাণিত হয়েছে। তাই এই জবানবন্দি কেবল তার বিরুদ্ধে যাবে। তবে মেজর আহমেদ শরিফুল হোসেইন, ক্যাপ্টেন কিসমত হাসেম ও ক্যাপ্টেন নাজমুল হোসেন আনসারকে জড়িয়ে তার এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিয়ে সমর্থিত না হওয়ায় এই তিন আসামির বিরুদ্ধে তা বিবেচনায় আনা হল না। এই একই বিবেচনায় ঢাকার দায়রা জজ আদালত এ মামলায় দফাদার মারফত আলী ও এলডি আবুল হোসেন মৃধাকে খালাস দিয়েছিল। সরকার পক্ষ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় মেজর আহমেদ শরিফুল হোসেইন, ক্যাপ্টেন কিসমত হাসেম ও ক্যাপ্টেন নাজমুল হোসেন আনসারকে খালাস দেওয়া হল। তাদের মৃত্যুদন্ডের রায় বাতিল করা হল। লে. কর্নেল (অব) মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), ক্যাপ্টেন (অব) আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিনকে দায়রা আদালত সঠিকভাবেই মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করেছেন। তাদের ক্ষেত্রে ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ করা হল। লে. কর্নেল (অব) মহিউদ্দিন আহমেদের (আর্টিলারি) আপিল খারিজ করা হল। হাইকোর্ট এর আগে ২০০০ সালের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় বিভক্ত রায় দিয়েছিল। বিচারপতি মো. রুহুল আমিন নিু আদালতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১৫ আসামির ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে পাঁচজনকে খালাস দিয়েছিলো। অপর বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডই বহাল রাখেন। বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি হিসেবে চূড়ান্ত রায় দেন। এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেরিতে হলেও জাতি তার প্রাপ্য পেয়েছে : ড. কামাল হোসেন ঢাকা,বাংলাদেশ, ১৯ নভেম্বর (বাসস) : আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার রায়কে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, দেরিতে হলেও বাঙালি জাতি তাদের প্রাপ্য পেয়েছে।তিনি বলেন, জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের বিচার যারা আটকে রেখেছিল, তাদেরও বিচার হওয়া উচিত।আজ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের বিচার লাভের যে সাংবিধানিক অধিকার দেশবাসীর রয়েছে তা প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সংবিধানের ওপর আঘাত করা হয়েছিল। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান ও জাতির জনকের বিচার হবে না- এটা কি কল্পনা করা যায়?তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন এ জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন-ান। তার ডাকে সাড়া দিয়ে সমগ্র জাতি অবিস্মরণীয় মূল্য দিয়ে স্বাধীনতা এনেছে। তাঁর হত্যাকাণ্ড স্বাধীনতার ওপর আঘাত। হত্যাকারীরা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি।ড. কামাল বলেন, আইন অনুযায়ী বিচার হবে এটা সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত। তা সত্ত্বেও ৩৪ বছর জাতিকে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে। তিনি বলেন, হত্যাকারীরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে দম্ভের সাথে প্রচার করেছে তাদেরকে রক্ষার জন্যই তথাকথিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবেই আইনের অধিকার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। আজকের এই রায় সাংবিধানিক শাসনের যে প্রতিশ্রুতি সর্বোচ্চ আদালত তা পালন করেছেন। দেরিতে হলেও জাতির জনকের হত্যার বিচার হলো।তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সংবিধানের ওপর যে আঘাত করা হয়েছিল, তার বিচারের রায় ঘোষণার মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস- হলো। তিনি বলেন, আজকের এই রায় ঐতিহাসিক। এই রায় পুরো জাতির একটা বড় অর্জন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবি করে যারা সংগ্রাম-আন্দোলন করেছেন, জীবন দিয়েছেন, তাদের একটা তালিকা হওয়া উচিত।‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কলঙ্কময় রাত্রিতে হত্যার সময় আমি দেশে ছিলাম না, এই হত্যার বিচার চেয়ে পাঁচ বছর নির্বাসনে ছিলাম। দেশে থাকলে ঘাতকরা হয়তো আমাকেও টার্গেট করতো’ উল্লেখ করে ড. কামাল বলেন, সংবিধানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিচার পাওয়ার অধিকার যদি বাধাগ্রস- হয় তাহলে আমাদের সকলকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। স্বাধীনতার শত্রু ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

সেদিন যা ঘটেছিল

সেদিন যা ঘটেছিল সুমন মাহবুব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ঢাকা, নভেম্বর ১৯ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)-- পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট। ভোররাত। ধানমণ্ডির বাড়িটি আক্রান্ত হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মীয় ও মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুর রব সেরনিয়াবাতের হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে যান। যে ঘরে বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়েছিল মো. সেলিম (আব্দুল) ও আব্দুর রহমান শেখ (রমা)। উপর থেকেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় তার ব্যক্তিগত সহকারি এ এফ এম মহিতুল ইসলামকে টেলিফোন করে বলেন, "সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতিকারীরা আক্রমণ করেছে। জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন লাগা।" পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে, মহিতুল গণভবন (তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) এক্সচেঞ্জে চেষ্টা করতে থাকেন। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রক্ষীরা বিউগল বাজিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন শুরু করা মাত্রই বাড়িটি লক্ষ করে দক্ষিণ দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ শুরু হয়। একটু পরেই বঙ্গবন্ধু তার ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। ঘুম থেকে ওঠে গৃহকর্মী আব্দুল আর রমা। বেগম মুজিবের কথায় রমা নিচে নেমে মেইন গেটের বাইরে এসে দেখেন সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে এগুচ্ছে। রমা বাড়ির ভেতরে ফিরে দেখেন, লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় নামছেন। দোতলায় গিয়ে দেখেন, বেগম মুজিব আতঙ্কিত অবস্থায় ছোটাছুটি করছেন। রমা আর দোতলায় দাঁড়িয়ে না থেকে তিনতলায় চলে যান এবং বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামালকে ঘুম থেকে তোলেন। ঘটনা শুনে শার্ট-প্যান্ট পড়ে নিচতলায় নামেন শেখ কামাল। সুলতানা কামাল আসেন দোতলা পর্যন্ত। রমা দোতালায় শেখ জামাল ও তার স্ত্রীকেও ঘুম থেকে তোলেন। জামা-কাপড় পরে শেখ জামাল তার স্ত্রীকে নিয়ে দোতলায় বেগম মুজিবের কক্ষে যান। ওদিকে গোলাগুলির মধ্যে অভ্যর্থনা কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সামনেই বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন মহিতুল। পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার এক পর্যায়ে রিসিভার নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেন, "আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি ..."। বঙ্গবন্ধু তার কথা শেষ করতে পারেননি। একঝাঁক গুলি জানালার কাচ ভেঙে অফিসের দেয়ালে লাগে। কাচের এক টুকরায় মহিতুলের ডান হাতের কনুই জখম হয়। ওই জানালা দিয়ে গুলি আসতেই থাকে। বঙ্গবন্ধু টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন এবং মহিতুলের হাত ধরে কাছে টেনে শুইয়ে দেন। এর মধ্যেই গৃহকর্মী আব্দুলকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তার পাঞ্জাবি ও চশমা পাঠিয়ে দেন বেগম মুজিব। কিছুক্ষণ পর গুলিবর্ষণ থেমে গেলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে আব্দুলের হাত থেকে পাঞ্জাবি আর চশমা নিয়ে পরেন। নিচতলার এই ঘর থেকে বারান্দায় বের হয়ে বঙ্গবন্ধু পাহারায় থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বলেন, "এতো গুলি হচ্ছে, তোমরা কী করছো ?" এ কথা বলেই বঙ্গবন্ধু উপরে চলে যান। বঙ্গবন্ধু উপরে উঠতে না উঠতেই শেখ কামাল নিচে নেমে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেন, "আর্মি আর পুলিশ ভাইরা, আপনারা আমার সঙ্গে আসেন।" এ সময় শেখ কামালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান মহিতুল ইসলাম ও পুলিশের ডিভিশনাল সুপারিনটেনডেন্ট (ডিএসপি) নুরুল ইসলাম খান। ঠিক তখনই মেজর নূর, মেজর মহিউদ্দিন (ল্যান্সার) এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা সৈন্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢোকে। গেটের ভেতর ঢুকেই তারা 'হ্যান্ডস্ আপ' বলে চিৎকার করতে থাকে। মহিতুল ইসলামকে টেনে ঘরের মধ্যে নিয়ে যান নুরুল ইসলাম খান। কোনো কথা না বলেই শেখ কামালের পায়ে গুলি করে বজলুল হুদা। নিজেকে বাঁচাতে লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মহিতুলকে বলতে থাকেন, "আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল। আপনি ওদেরকে বলেন।" মহিতুল ঘাতকদের বলেন, "উনি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল।" এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালকে লক্ষ করে বজলুল হুদা তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গে মারা যান শেখ কামাল। এর মধ্যে একটা গুলি মহিতুলের হাঁটুতে আরেকটা নুরুল ইসলামের পায়ে লাগে। এ অবস্থাতেই মহিতুলকে টেনে নুরুল ইসলাম তার কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তারা দেখেন, পুলিশের বিশেষ শাখার এক সদস্য দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে। অস্ত্রটা তার পায়ের কাছে পড়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে ওই ঘরে ঢুকে বজলুল হুদা সবাইকে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর আদেশ দেয়। নিচে কী হচ্ছে তার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দোতলায় তার ঘরের দরজা বন্ধ করে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ফোনে তার সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিনকে পান। তিনি তাকে বলেন, "জামিল, তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আর্মির লোকরা আমার বাসা অ্যাটাক করেছে। শফিউল্লাহকে ফোর্স পাঠাতে বলো।" তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকেও ফোন করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাকে বলেন, "শফিউল্লা তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে, কামালকে (শেখ কামাল) বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।" জবাবে শফিউল্লাহ বলেন, "আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং। ক্যান ইউ গেট আউট অফ দ্যা হাউজ?" বঙ্গবন্ধুর কথা শোনার পরই কর্নেল জামিল তার ব্যক্তিগত লাল রঙের গাড়িটি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সঙ্গে ছিলেন নিজের গাড়িচালক আয়েনউদ্দিন মোল্লা। কিন্তু, পথেই সোবাহানবাগ মসজিদের কাছে তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। পালিয়ে বেঁচে যান আয়েনউদ্দিন। এদিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটের সামনে মহিতুল, নুরুল ইসলাম, আব্দুল মতিন, পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যসহ অন্য সদস্যদের সারি করে দাঁড় করানো হয়। এর মধ্যে ঘাতকদের একজন পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যকে গুলি করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি পড়ে যান। এরপর ঘাতকরা গুলি করতে করতে ওপরে চলে যায়। তারা শেখ জামালের ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেওয়া গৃহকর্মী আব্দুলকে গুলি করে। হাতে ও পেটে গুলিবিদ্ধ অবস্থাতে তিনি সিঁড়ির পাশে গিয়ে হেলান দিয়ে বসে থাকেন। "তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?" বঙ্গবন্ধুর ঘরে তিনি ছাড়াও ছিলেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরে অবস্থান নেয়। গোলাগুলি থামলে বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসলেই ঘাতকরা তাকে ঘিরে ধরে। মেজর মহিউদ্দিন ও তার সঙ্গের সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে যেতে থাকে। ঘাতকদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, "তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?" রক্তে ভেসে যায় সারা সিঁড়ি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে মহিউদ্দিন ঘাবড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বলেন, "তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি, কী করবি- বেয়াদবি করছিস কেন?" এ সময় নিচতলা ও দোতলায় সিঁড়ির মাঝামাঝি অবস্থান নেয় বজলুল হুদা ও নূর। বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে আসার সময় নূর কিছু একটা বললে মহিউদ্দিন সরে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে বজলুল হুদা ও নূর তাদের স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। বঙ্গবন্ধুর বুকে ও পেটে ১৮টি গুলি লাগে। নিথর দেহটা সিঁড়ির মধ্যে পড়ে থাকে। সারা সিঁড়ি ভেসে যায় রক্তে। রমাই প্রথম বেগম মুজিবকে জানায়, বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর পেছন পেছন রমাও যাচ্ছিলো। কিন্তু, ঘাতকরা তাকে ঘরের মধ্যে চলে যেতে বলে। এর মধ্যে দোতলায় শেখ রেহানার ঘরে থাকা তার চাচা শেখ নাসের ওই কক্ষে যায়। তার হাতে গুলি লাগার ক্ষত ছিলো। রমাই প্রথম বেগম মুজিবকে জানায়, বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়েছে। এ সময় ওই ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, শেখ নাসের ও রমা। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে নিচে নেমে এসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর পরই মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন তাদের সৈন্যসহ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসে। আজিজ পাশা তার সৈন্যদের নিয়ে দোতলায় চলে যায়। তারা বঙ্গবন্ধুর ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা দরজায় গুলি করে। তখন বেগম মুজিব দরজা খুলে দেয় এবং ঘরের মধ্যে যারা আছে তাদের না মারার জন্য অনুরোধ করেন। ঘাতকরা বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে আসতে থাকে। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেই বেগম মুজিব কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং চিৎকার দিয়ে বলেন, "আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।" রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ বেগম মুজিব নিচে নামতে অস্বীকৃতি জানান। ঘাতকরা শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যায়। আর, বেগম মুজিবকে তার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। বেগম মুজিবসহ বঙ্গবন্ধুর ঘরে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন। বেগম মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে। বাঁ'দিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। আর রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ। শেখ মুজিব বেটার দ্যান শেখ নাসের শেখ নাসের, শেখ রাসেল আর রমাকে নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদেরকে সবাইকে সঙ্গে লাইনে দাঁড় করানো হয়। এ সময় শেখ নাসের ঘাতকদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আমি তো রাজনীতি করি না। কোনো রকম ব্যবসা-বাণিজ্য করে খাই।" ঘাতকরা একে অপরকে বলে, "শেখ মুজিব বেটার দ্যান শেখ নাসের।" এরপর তারা শেখ নাসেরকে বলে, "ঠিক আছে। আপনাকে কিছু বলবো না। আপনি ওই ঘরে গিয়ে বসেন।" এই বলে তাকে অফিসের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুমে নিয়ে গুলি করে। এরপর শেখ নাসের 'পানি পানি' বলে গোঙাতে থাকেন। তখন শেখ নাসেরের ওপর আরেকবার গুলিবর্ষণ করা হয়। 'ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?' লাইনে দাঁড়িয়ে শেখ রাসেল প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলে, "ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?" মহিতুল জবাব দেয়, "না ভাইয়া, তোমাকে মারবে না।" এ সময় শেখ রাসেল তার মায়ের কাছে যেতে চাইলে আজিজ পাশা মহিতুলের কাছ থেকে জোর করে তাকে দোতলায় নিয়ে যেতে বলে। আজিজ পাশার কথা মতো এক হাবিলদার শেখ রাসেলকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। রাসেলের চোখ বের হয়ে যায়। আর মাথার পেছনের অংশ থেতলে যায়। রাসেলের দেহটি পড়ে থাকে সুলতানা কামালের পাশে। পুরো ঘরের মেঝেতে মোটা রক্তের আস্তর পড়ে গিয়েছিলো। এর মাঝেই ঘাতকের দল লুটপাট চালায়। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেদিন তার দু'মেয়ে ছিলেন না। বড় মেয়ে শেখ হাসিনা স্বামীর সঙ্গে জার্মানিতে ছিলেন। ছোট বোন শেখ রেহানাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন তারা। ঘাতকদের প্রস্তুতি ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর টু-ফিল্ড রেজিমেন্টের যানবাহনগুলো সচল হয়ে ওঠে। ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণে অবস্থিত ইউনিট থেকে ১০৫এমএম কামানগুলোকে ভারি ট্রাক দিয়ে টেনে নির্মাণাধীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় নিয়মিত নৈশ প্রশিক্ষণের জন্য। রাত ১০টার দিকে সেনানিবাসের উত্তর প্রান্ত থেকে বেঙ্গল ল্যান্সারের টি-৫৪ ট্যাংকগুলো ইউনিট থেকে বেরিয়ে পড়ে। এয়ারপোর্টে ১৮টি কামান ও ২৮টি ট্যাংক একত্রিত হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে মেজর ডালিম, মেজর নূর, মেজর হুদা, মেজর শাহরিয়ার, মেজর পাশা, মেজর রাশেদ প্রমুখ সেখানে জড়ো হয় । ১৫ আগস্ট রাতের প্রথম প্রহরে মেজর ফারুক অফিসারদের নির্দেশ দেয় বিমান বন্দরের কাছে হেড কোয়ার্টারে স্কোয়াড্রন অফিসে মিলিত হতে। অফিসারদের আপারেশনের পরিকল্পনা জানায় মেজর ফারুক। সে-ই ছিলো এই অপারেশনের দায়িত্বে। প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুর বাড়ি সরাসরি আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। ওই বাড়িকে ঘিরে দু'টো বৃত্ত তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। আরো সিদ্ধান্ত হয়, ভেতরের বৃত্তের সদস্যরা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করবে। বাইরে থেকে রক্ষীবাহিনী বা ভেতর থেকে সেনাবাহিনীর কোনো আক্রমণ এলে তা ঠেকানোর দায়িত্বে দেওয়া হয় বাইরের বৃত্তের সদস্যদের। এর দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর নূর ও মেজর হুদাকে। সিদ্ধান্ত হয়- তারা ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর রোড, সোবাহানবাগ মসজিদ এবং ৩২ নম্বর ব্রিজে রোড ব্ল�ক করবে। প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুর বাসা আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ধানমণ্ডিতেই শেখ ফজলুল হক মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণেরও সিদ্ধান্ত হয়। ডালিমকে বঙ্গবন্ধুর বাসায় আক্রমণের সময় উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেন মেজর ফারুক। কিন্তু, পূর্ব সম্পর্কের অজুহাতে বঙ্গবন্ধুর বাসায় আক্রমণে উপস্থিত না থেকে স্বেচ্ছায় সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণের দায়িত্ব নেয় ডালিম। ভারি মেশিনগান সংযোজিত দ্রুতগতির একটি জিপে রওনা দেয় ডালিম। সঙ্গে এক প্লাটুন ল্যান্সারসহ একটি বড় ট্রাক। শেখ মণির বাসায় আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয় রিসালদার মোসলেমউদ্দিনকে। তার সঙ্গে দেওয়া হয় দু'প্ল�াটুন সৈন্য। এক কোম্পানি সেনাসহ রেডিও স্টেশন, বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউমার্কেট এলাকার দায়িত্বে থাকে মেজর শাহরিয়ার। একই সঙ্গে ওই গ্র"পকে বিডিআর থেকে কোনো ধরনের আক্রমণ হলে প্রতিহত করার দায়িত্বও দেওয়া হয়। ২৮ টি গোলাবিহীন ট্যাংক নিয়ে শের-ই বাংলা নগরে রক্ষীবাহিনীকে প্রতিহত করার দায়িত্ব নেন মেজর ফারুক নিজে। তবে ট্যাংকের মেশিনগানগুলোয় প্রচুর গুলি ছিলো। মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের জন্য ১২টি ট্রাকে সাড়ে তিনশ' সাধারণ সৈনিককে তৈরি করা হয়। মেজর রশিদের সরাসরি কোনো আক্রমণের দায়িত্ব ছিলো না। তার দায়িত্ব ছিলো হত্যাকাণ্ড পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সমন্বয় করা। তার নেতৃত্বে থাকা ১৮টি কামান গোলা ভর্তি করে যুদ্ধাবস্থায় তৈরি রাখা হয়। কামানগুলো রক্ষীবাহিনীর হেড কোয়ার্টার এবং বঙ্গবন্ধুর বাসা লক্ষ করে তাক করা হয়। একটি মাত্র ১০৫ এমএম হাউইটজার কামান রাখা হয় আর্টিলারির মেজর মহিউদ্দিনের অধীনে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উল্টো দিকে লেকের পাড়ে। দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর সবাইকে তাজা বুলেট ইস্যু করা হয়। ঘাতকের দল বিমানবন্দর এলাকা থেকে ভোররাত ৪ টার দিকে ধানমণ্ডির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ফারুকের নেতৃত্বে ২৮ টি ট্যাংক বিমানবন্দর সড়কে বনানীর এম.পি. চেকপোস্ট দিয়ে সেনানিবাসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এর মধ্যে ফজরের আজান পড়ে যায়। ফারুক তার ট্যাংক নিয়ে ৪৬ ব্রিগেড ইউনিটের লাইনের একেবারে ভেতর দিয়ে বাইপাস সড়ক ধরে সেনাসিবাসের প্রধান সড়কে চলে আসে। ঢাকা সেনানিবাসে সে সময়ে বিমানবাহিনীর যে হেলিপ্যাড ছিলো, তার ঠিক উল্টো দিকের একটি গেট দিয়ে ফারুক তার ট্যাংক নিয়ে বিমানবন্দরের (পুরনো বিমানবন্দর) ভেতর ঢুকে পড়ে। এ সময় ফারুককে অনুসরণ করছিলো মাত্র দু'টি ট্যাংক। বাকি ট্যাংকগুলো পথ হারিয়ে জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে ফার্মগেটের দিকে এগুতে থাকে। ফারুক এয়ারপোর্টের পশ্চিম দিকের দেয়াল ভেঙে রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারের সামনে উপস্থিত হয়। রাত সোয়া ৫ টার দিকে মেজর ডালিম ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিনের নেতৃত্বে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ মণির বাসা আক্রান্ত হয়। শেখ মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যা করে ঘাতকরা। প্রাণে বেঁচে যান শেখ মণির ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস। ডালিমের নেতৃত্বে হত্যা করা হয় আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে বেবী, ১২ বছরের ছেলে আরিফ, চার বছরের নাতি বাবু (আবুল হাসনাত আবদুল্লার ছেলে), ভাতিজা শহীদ সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে আবদুল নইম খান রিন্টু (আওয়ামী লীগ নেতা আমীর হোসেন আমুর খালাতো ভাই), তিন অতিথি এবং চারজন কাজের লোককে। দাফন পরের দিন ঢাকার স্টেশন কমান্ডার আব্দুল হামিদ বঙ্গবন্ধুর লাশ ছাড়া ১৫ আগস্টে নিহতদের লাশ দাফন করেন। আব্দুল হামিদ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে কফিনে নিহতদের লাশ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে শেখ মণি ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সদস্যদের লাশ সংগ্রহ করে বনানী গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করেন। বনানী কবরস্থানে সারিবদ্ধ কবরের মধ্যে প্রথমটি বেগম মুজিবের, দ্বিতীয়টি শেখ নাসেরের, এরপর শেখ কামাল, সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, শেখ রাসেল, ১৩ নম্বরটি শেখ মণির, ১৪ নম্বরটি আরজু মণির, ১৭ নম্বরটি সেরনিয়াবাতের আর বাকি কবরগুলো সেদিন এই তিন বাড়িতে যারা মারা গেয়েছিলেন তাদের। ১৬ আগস্ট সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় টুঙ্গীপাড়ায়। সেখানে তাকে দাফন করা হয় তার বাবার কবরের পাশে। সেনাবাহিনীর ওই হেলিকপ্টারের পাইলট ছিলেন ফ্লাইট লে. শমশের আলী। সূত্র: বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দেওয়া এ এফ এম মহিতুল ইসলাম, আব্দুর রহমান শেখ (রমা), মো. সেলিম (আব্দুল), অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার মো. কুদ্দুস শিকদার, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল হামিদ, সাবেক সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ, আয়েনউদ্দিন মোল্লা (সোবহানবাগে নিহত বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিনের গাড়িচালক) এর সাক্ষ্য এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল হামিদের বই 'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা'।

Monday, November 16, 2009

’বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা’ শীর্ষক সমেমলনে শেখ হাসিনা সবার খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানালেন

বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা’ শীর্ষক সমেমলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
সবার খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানালেন
ভিওবিডি, নিউইয়র্ক থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার রোমে জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সদর দপ্তরে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক তিনদিনব্যাপী ওয়ার্ল্ড সামিটে ভাষণ দেন।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবার জন্য, বিশেষ করে প্রানিতক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শুধু উৎপাদনই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। এ জন্য জাতীয় ও আনতর্জাতিক পর্যায়ে স্বচ্ছ ও সমতাভিত্তিক খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সোমবার রাতে রোমে জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা আয়োজিত ’বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা’ শীর্ষক সমেমলনে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যনত বিশ্বব্যাপী হঠাৎ খাদ্য ঘাটতি এবং খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার প্রেক্ষাপটে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এ হুমকি আরো বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ ১০০ কোটি মানুষ এখন অব্যাহত ক্ষুধা-দারিদ্র্যের সমমুখীন। বিশ্বের যে কোনো মানুষের জন্যই এ চিত্র বেদনার এবং কষ্টের। ক্ষুধাপীড়িত এ জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই বাস করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে। তাদের একদিকে খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের উন্নয়ন কর্মসূচি এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হচ্ছে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে এরই মধ্যে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়েছে। ঋণ সুবিধা কমে গেছে এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও হ্রাস পেয়েছে। গত দুই বছরে খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল অবস্থায় নিয়ে গেছে। পাশাপাশি এ দুরবস্থার সঙ্গে যোগ হয়েছে সার-বীজের বাড়তি মূল্য এবং পানি ও জ্বালানির স্বল্পতা। উন্নত দেশগুলোতে অনুন্নত দেশগুলোর পণ্য প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করায় এ পরিস্থিতি আরো নাজুক আকার ধারণ করেছে।শেখ হাসিনা বলেন, গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও আনতর্জাতিকভাবে প্রশংসিত নির্বাচনের মাধ্যমে তার সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন সরকারকে এসব সমস্যার সবই মোকাবেলা করতে হচ্ছে। খাদ্য সমস্যা নিরসনের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তারা কৃষি নীতিমালা বাসতবায়নের পদক্ষেপ নেন। ১৯৯৬-২০০১ সালে তার সরকার দায়িত্ব পালনকালে উৎপাদনবান্ধব কৃষিনীতি বাসতবায়নের ফলে তারা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেন। এ জন্য তারা ফাও-এর সেরেস পদকে ভূষিত হয়েছিলেন। এবার দায়িত্ব নেয়ার পর তারা সারের দাম দুদফা কমিয়ে কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এনেছেন এবং সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি কৃষকরা যাতে তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় সে জন্য বাজারজাতকরণের বাধাগুলো দূর করার ব্যবস্থা নিয়েছেন।তিনি বলেন, খাদ্যঘাটতি পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারা বন্যা, খরা, লবণাক্ততা সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন শস্যজাত ও অর্থকরী ফসল উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা কার্যক্রমকে জোরদার করেছেন। এছাড়া কৃষকরা যাতে সহজে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন, সহজে কৃষিঋণ পেতে পারেন সে ব্যবস্থাও নিয়েছেন। পাশাপাশি তারা শস্যের বহুমুখীকরণ কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং সারা বছর খাদ্যশস্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জনú